kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

আজ বিশ্ব বাঘ দিবস

সুন্দরবনের বাঘ রক্ষায় কর্মসূচি প্রয়োজন

করোনাকাল বিবেচনায় বন বিভাগের প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি

গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা   

২৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শৌর্য, বিক্রম ও সুন্দরের প্রতীক বাঘ আমাদের জাতীয় পশু। প্রাকৃতিক নানা কারণে বিপদাপন্ন এই প্রাণী রক্ষায় দেশে দেশে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশের দেশ ভারতে ১৯৭২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে ‘টাইগার প্রজেক্ট’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। দেশে ২০১৩ সাল থেকে ইউএসএইডের সহায়তায় বাঘসংক্রান্ত একটি চার বছর মেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়।

আগামী বছর (২০২২) রাশিয়ায় বাঘ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। সেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ১৩টি দেশের রাষ্ট্র-সরকারপ্রধানদের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। এটি সামনে রখে বন বিভাগ বাঘ সংরক্ষণে একটি প্রকল্প তৈরি করেছিল। সম্প্রতি তা পরিকল্পনা কমিশন থেকে ফেরত এসেছে। করোনাকালে অন্য বিষয়ে গুরুত্ব দিতে গিয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন পায়নি। তবে কিছু অদলবদল করে প্রকল্পটি আবারও অনুমোদনের জন্য অচিরেই জমা দেওয়া হবে।

২০১০ সাল থেকে প্রতিবছর ২৯ জুলাই দিনটি বিশ্ব বাঘ দিবস হিসেবে পালন করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুনিয়াজুড়ে বিপন্নতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে রাশিয়ায় প্রথমবারের মতো বাঘ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে বলা হয়, আগামী ১২ বছরে বাঘের সংখ্যা দ্বিগুণ করতে হবে। এরপর দেশে দেশে বাঘ সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়। বাংলাদেশেও একটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়। বন বিভাগের সঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ‘ওয়াইল্ড টিম’ কার্যক্রমটি বাস্তবায়ন করে।

বলা হয়, বাঘ শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বনাঞ্চল সুন্দরবনের পাহারাদার। বাংলাদেশে এখন শুধু এই বনেই বাঘ বসবাস করে। সম্পদ আহরণের জন্য মানুষ এই বনাঞ্চলে প্রবেশ করে, তখন কখনো কখনো বাঘের আক্রমণে মানুষের মৃত্যু হয়। গত তিন মাসে এ রকম পাঁচটি অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তবে বাঘ লোকালয়ে এসে কখনো মানুষকে আক্রমণ করে না।

আগে লোকালয়ে বাঘ আসার ঘটনা শোনা যেত, সেই সময় মানুষের হাতে বাঘের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে। এখন বাঘ যেমন আসে না, মানুষের বাঘ সম্পর্কে ধারণাও পাল্টেছে। বাঘের গুরুত্ব এবং টিকিয়ে রাখার বিষয়ে ওয়াইল্ড টিম একটি স্বেচ্ছাসেবী দল গড়ে তুলেছে, যারা শুধু বাঘ নয়, যেকোনো বণ্য প্রাণী এলে তা উদ্ধার করে বনে ছেড়ে দেয়।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, ভুটানে বাঘের সংখ্যা এরই মধ্যে দ্বিগুণ হয়েছে, নেপাল ও ভারতেও বাঘের সংখ্যা বেশ বেড়েছে। সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ২০১৮ সালের সর্বশেষ হিসাব মতে ১১৪।

আগামী বছর রাশিয়ায় অনুষ্ঠেয় বাঘ সম্মেলন ঘিরে দেশে বাঘ জরিপসহ বন্য প্রাণী সংরক্ষণে চলমান আইনটি সংশোধন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বাঘের বংশবিস্তার, সংরক্ষণ, বাঘের খাদ্য হরিণ, শূকর বৃদ্ধি, বাঘের আবাসস্থল উন্নত করা এবং বয়স্ক বাঘের গলায় রেডিও জিপিএস স্থাপন, প্রাণীর মাধ্যমে মানবদেহে ভাইরাস ছড়ায় কি না প্রভৃতি পরীক্ষার জন্য একটি প্রকল্প পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছিল।

জানতে চাইলে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেইন কালের কণ্ঠকে বলেন, বাঘ রক্ষা মানে তো শুধু বাঘ নয়; বাঘের আবাসস্থল, খাদ্যপ্রাপ্তি, বিচরণস্থল সব কিছু রক্ষা করার বিষয়। এ কারণে সার্বিক দিক বিবেচনা করে সরকারের অর্থায়নে একটি প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান করোনা বাস্তবতায় তা অনুমোদিত হয়নি; সেটি আবারও একটু পরিবর্তন করে জমা দেওয়া হবে।

বাঘ তথা সুন্দরবনে প্রাণী সুরক্ষা ও সচেতনতা সৃষ্টিতে কর্মরত ওয়াইল্ড টিমের প্রধান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিদ্যা বিভাগের সাবেক প্রধান অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বর্তমানে শুধু সুন্দরবনে বাঘ বসবাস করে। সুন্দরবন মানে জলবেষ্টিত একটি ঘেরা জায়গা। এখানেই তার নিরাপদ বাসের ব্যবস্থা করতে পারলে সে ভালো থাকবে। আশার কথা, আগের গণনা থেকে ২০১৮ সালে বাঘের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে; যদিও তা সংখ্যায় কম, তবে বাড়ছে। বাঘ সম্পর্কে সুন্দরবনসংলগ্ন জনপদের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও এখন অনেক ইতিবাচক।’

সাম্প্রতিককালে পূর্ণিমার সময় সুন্দরবন ও সংলগ্ন নদ-নদীতে জোয়ারের প্রাবল্য দেখা দিচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের কারণে সৃষ্ট জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবনের প্রায় পুরো এলাকা ডুবে গিয়েছিল। বিষয়টি উল্লেখ করে প্রধান বন সংরক্ষক আমীর হোসেইন জানান, জলোচ্ছ্বাসের সময় সুন্দরবনের প্রাণিকুলকে টিকিয়ে রাখতে বন বিভাগের পাহারা চৌকির কাছাকাছি মাটির উঁচু টিবি তৈরির কথা ভাবা হচ্ছে; যাতে বন জলমগ্ন হয়ে পড়লে উঁচু স্থানে তারা আশ্রয় নিতে পারে। এবারের এই ঘূর্ণিঝড়ের পরে বন থেকে একাধিক হরিণ ভেসে লোকালয়ে চলে এসেছিল। 

সুন্দরবনে বাঘের বর্তমান আবাসস্থল ২৩ শতাংশ। বন বিভাগ এটি বাড়িয়ে ৫২ শতাংশ করার পরিকল্পনা করেছে। বাঘের বংশবিস্তারের জন্য বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। জেলে সেজে ফাঁদ পেতে হরিণ ও বাঘ শিকারিদের তালিকা করে সচেতন করার কর্মসূচিও নেওয়া হচ্ছে। ২০১৫ ও ২০১৮ সালে সুন্দরবনে বাঘ জরিপ করা হয়।



সাতদিনের সেরা