kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ আশ্বিন ১৪২৮। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৫ সফর ১৪৪৩

টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন জেলায় বন্যা, ব্যাপক ক্ষতি

চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের শঙ্কায় সরানো হচ্ছে মানুষ

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৯ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



টানা বৃষ্টিতে বিভিন্ন জেলায় বন্যা, ব্যাপক ক্ষতি

টানা ভারি বৃষ্টিতে দেশের বিভিন্ন জেলার নিচু এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে লাখ লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে ফসলের ক্ষেত, রাস্তা ও চিংড়িঘের। কোনো কোনো জেলায় বৃষ্টির সঙ্গে যোগ হয়েছে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও জোয়ারের পানি। টানা বর্ষণের কারণে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসে প্রাণহানির আশঙ্কায় গতকাল বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত শতাধিক পরিবারের চার শতাধিক সদস্যকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়েছে জেলা প্রশাসন।

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টি ও জোয়ারের পানিতে উপকূলীয় জেলা বাগেরহাটের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। জেলার শরণখোলা, মোরেলগঞ্জ, রামপাল ও মোংলা উপজেলার নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার পরিবার (শরণখোলায়ই ১০ হাজার) পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে সবজিক্ষেত, বহু পুকুর, প্রায় দুই হাজার চিংড়িঘের, রাস্তাঘাট ও বহু বাড়িঘর। কয়েক শ বিঘা আমন ধানের বীজতলা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। নদ-নদীতে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতায় পানি বেড়েছে। মাঝেমধ্যে দমকা বাতাস বইছিল। গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৯৬.৬৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে কৃষি বিভাগ। এদিকে অস্বাভাবিক জোয়ারে সুন্দরবনের বিভিন্ন অংশে পানি ঢুকে পড়েছে। বাগেরহাটে মঙ্গলবার সকাল থেকে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়ে গতকাল দুপুর পর্যন্ত ঝরে। এরপর থেমে থেমে বৃষ্টি হয়।

শরণখোলায় মঙ্গলবার ভোররাত থেকে ভারি বর্ষণ শুরু হয়। গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখার সময়ও ভারি বৃষ্টির সঙ্গে দমকা বাতাস বইছিল। নদ-নদীর পানি বেড়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে দুই থেকে তিন ফুট বেশি। টানা বৃষ্টির ফলে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রায় অর্ধশত পরিবারসহ উপজেলার চারটি ইউনিয়নের কমপক্ষে ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আউশ ও আমনের বীজতলার ৮০ শতাংশই ডুবে রয়েছে। শাক-সবজিসহ অন্যান্য মৌসুমি ফসলও তলিয়ে গেছে। ঘের ও পুকুর তলিয়ে ভেসে গেছে প্রায় অর্ধকোটি টাকার চাষের মাছ। ঘরে পানি ওঠায় শত শত পরিবারে দুই দিন ধরে রান্নাবান্না বন্ধ ছিল।

কয়েক দিনের প্রবল বর্ষণ ও মাতামুহুরী নদীতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ভয়াবহ বন্যা দেখা দিয়েছে কক্সবাজারের চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলায়। অন্তত ২০টি ইউনিয়ন এবং চকরিয়া পৌরসভার লোকালয় বানে ভাসছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে অন্তত চার লাখ মানুষ। সড়ক কয়েক ফুট পানির নিচে থাকায় ভেঙে পড়েছে যোগাযোগব্যবস্থা। টিউবওয়েল ও বসতবাড়ির রান্নার চুলা তলিয়ে যাওয়ায় খাবার ও বিশুদ্ধ পানির অভাবে পড়েছে পরিবারগুলো। অনেক স্থানে বাড়ির চালা পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে হাজারো মানুষ।

মাতামুহুরী নদীতে আসা উজানের পানির তোড়ে কয়েকটি স্থানে ভেঙে গেছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) বেড়িবাঁধ। এতে চকরিয়ার উপকূলীয় সাতটি ইউনিয়নে নতুন করে ঢুকে পড়ছে বানের পানি। ভারি বর্ষণ অব্যাহত থাকায় ভয়াবহ পাহাড়ধসের শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে মানুষের মাঝে। জেলা প্রশাসন দুই উপজেলায় ১১০ টন জিআর চাল বরাদ্দ দিয়েছে। বন্যাকবলিত এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় মানুষ জরুরি প্রয়োজনে নৌকায় যাতায়াত করছে। মাতামুহুরীতে উজানের পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে প্রবাহিত হচ্ছে। এর ওপর আছে টানা বর্ষণ। দুই উপজেলার ফসলি জমিও তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুরের মাছ।

কক্সবাজার পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামী বলেন, ‘চকরিয়ার বিএম চর ইউনিয়নের কন্যারকুম এলাকায় পাউবোর প্রায় ৩০ ফুট এবং কোনাখালী ইউনিয়নের মরংঘোনা পয়েন্টে এক চেইনের মতো ভেঙে গেছে। পানি নেমে গেলে দ্রুত বেড়িবাঁধ সংস্কার করা হবে।’

বরগুনার পাথরঘাটা উপকূলে প্রবল বর্ষণে পুকুর, দিঘি, ঘের ও ফসলের ক্ষেত সয়লাব হওয়ায় কৃষি ও মাছ চাষের ক্ষতির আশঙ্কা করছে সংশ্লিষ্ট বিভাগ। শুধু মৎস্য খাতে ক্ষতি হতে পারে কোটি টাকার ওপরে। গতকাল সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় উপজেলায় ৩১৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। জেলার বেতাগীতে কয়েক দিনের টানা প্রবল বর্ষণে বিষখালী নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে বাতাসে বিভিন্ন স্থানে গাছপালা ভেঙে ও উপড়ে পড়েছে।

সাতক্ষীরার কালীগঞ্জে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে ২০টি পরিবারের ঘরবাড়ি লণ্ডভণ্ডসহ দুই দিনের (মঙ্গল ও বুধবার) অতিবর্ষণে উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়। মঙ্গলবার রাত ৯টায় উপজেলার হাড়দ্দাহ গ্রামে পাঁচ মিনিটের এ ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বৃষ্টিতে বহু ঘরবাড়ি, ফসল, পুকুর, শত শত মাছের ঘের তলিয়ে যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তত্সংলগ্ন এলাকায় লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে পটুয়াখালীতে মঙ্গলবার দুপুর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি গতকালও ছিল। গতকাল সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ২৫১.৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এ বৃষ্টিপাত ২০০৬ সালের পর সর্বোচ্চ বলে জানিয়েছে জেলা আবহাওয়া অফিস। পটুয়াখালীসংলগ্ন বঙ্গোপসাগর বেশ উত্তাল রয়েছে। বাতাসের চাপ আগের চেয়ে কিছুটা বেড়েছে। সাগর ও নদীর পানি তিন থেকে চার ফুট বেড়েছে। তাই পায়রা বন্দরকে স্থানীয় ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলেছে আবহাওয়া অফিস। মাছ ধরার ট্রলারকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে চলাচল করতে বলা হয়েছে। টানা বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় কৃষকের সবজি আবাদের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গাছ পড়ে বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন বন্ধ রয়েছে। তলিয়ে গেছে দুমকী, কলাপাড়াসহ উপকূলের নিচু এলাকার অনেক ঘরবাড়ি, মাছের ঘের ও পুকুর। পটুয়াখালী শহরের বিভিন্ন সড়কে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রামে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় থেকে গত মঙ্গলবার রাত থেকে লোকজনকে সরানো শুরু হয়। সরিয়ে আনা লোকজনের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছে প্রশাসন। চালু করা হয়েছে একাধিক আশ্রয়কেন্দ্র। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. কামরুল হাসান ও জেলার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উমর ফারুক জানান, পাহাড়ধসের শঙ্কায় লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে আসতে মাইকিংও করা হয়।

[প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।]



সাতদিনের সেরা