kalerkantho

বুধবার । ৭ আশ্বিন ১৪২৮। ২২ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৪ সফর ১৪৪৩

জালে ইলিশ পড়ছে তবে আকারে ছোট

ধৈর্য ধরার আহবান বিশেষজ্ঞদের
বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈরী আবহাওয়া

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৮ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



জালে ইলিশ পড়ছে তবে আকারে ছোট

প্রায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশ শিকারে নেমেছেন জেলেরা। কিন্তু জালে প্রত্যাশা অনুযায়ী ইলিশ পড়ছে না। গতকাল পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালীর আগুনমুখা নদীতে। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রায় দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে জাল ভর্তি ইলিশের স্বপ্ন নিয়ে সাগর আর নদীতে নেমেছেন জেলেরা। কিন্তু জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ পড়ছে না। কোথাও কোথাও ইলিশ মিলছে; কিন্তু আকারে ছোট। সাগর উত্তাল থাকায় খালি ট্রলার নিয়েও ফিরতে হচ্ছে অনেক জেলেকে। স্থানীয় মৎস্য কর্মকর্তা ও ইলিশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টিপাত বাড়লে জালে ইলিশের সংখ্যা বাড়বে। এখনই হতাশ হওয়ার কিছু নেই।

নিজস্ব প্রতিবেদক (বরিশাল) ও রাঙ্গাবালী (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, মৎস্যজীবীরা ভেবেছিলেন নিষেধাজ্ঞা শেষে ইলিশের দেখা মিলবে। কিন্তু নদীতে ভরা মৌসুমেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ ধরা পড়ছে না। সারা দিনে দুই-এক ঝুড়ি মাছ এলেও তেমন হইচই নেই রাঙ্গাবালীর কোড়ালিয়া মাছ ঘাটে। নেই চিরচেনা সেই হাঁকডাক। ফলে উপজেলার প্রায় ২০ হাজার জেলে হতাশ হয়ে পড়েছেন।

কোড়ালিয়া আর পানপট্টি মৎস্যজীবীদের মাছ শিকারের ঠিকানা বলতে আগুনমুখা নদী। কোড়ালিয়া গ্রামের মৎস্যজীবী দেলোয়ার প্যাদা বলেন, ‘বছরের অন্য সময় মাছ ধরে সংসারটা চলে যায়। তখন কিছু টাকা ধার করতে হয়। মূল আয়টা হয় ইলিশের মৌসুমে। এ বছর ইলিশ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে আবার লঘুচাপের কারণে সাগর উত্তাল। জাল ফেলা যাচ্ছে না।’

পাথরঘাটার মৎস্যজীবী ইউসুফ হোসেন বলেন, ‘সত্যি আমরা কিছুই বুঝতে পারছি না। কেউ বলছেন ছোট ইলিশ ধরার বিধি-নিষেধ না মানার ফলে এমনটা হচ্ছে। কেউ বলছেন জলবায়ুর প্রভাব।’

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ, অ্যাকোয়াকালচার অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইলিশের মৌসুম বদলে যাচ্ছে। এ কারণে ভরা মৌসুমেও ইলিশ ধরা পড়ছে না।’

রাঙ্গাবালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. আনোয়ারুল হক বাবুল বলেন, ‘এবার বিলম্বে বৃষ্টি হয়েছে বলে ইলিশের দেখা তেমন মিলছে না। বৃষ্টির পানি বাড়লে মাছটা জাগে। বৃষ্টি যত বেশি হবে, মাছের তত দেখা মিলবে। দেরিতে হলেও মাছ হবে বলে আশা করা যায়।’

চাঁদপুর প্রতিনিধি জানান, ভরা বর্ষায় পদ্মা ও মেঘনায় স্রোতের সঙ্গে পানিও বেড়েছে। কিন্তু তাতে যোগ হয়নি রুপালি ইলিশের প্রাচুর্য। এতে হতাশ জেলেরা। কারণ অন্য বছর কিছুটা হলেও তাঁদের জালে ধরা পড়ত নানা আকারের ইলিশ। এবার একেবারে যে নেই, তা-ও নয়। সামান্য কিছু মিলছে, তবে আকারে ছোট।

সদর উপজেলার হরিণাঘাটের জেলে বিল্লাল মিশৌরী বলেন, ‘সেই মে মাস থেকে ইলিশের অপেক্ষায় আছি। ভেবেছিলাম বর্ষায় বড় ইলিশ ধরা পড়বে। কিন্তু যা পাচ্ছি আকারে ছোট।’ হাইমচরের চরভৈরবীর জেলে নেতা মানিক দেওয়ান অবশ্য আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আরো তিন মাস সময় হাতে আছে। কারণ অতীতেও দেখা গেছে মৌসুমের শেষ সময়ে এসে জালে প্রচুর ইলিশ ধরা পড়ে। এবারও হয়তো তা-ই হবে।’

ইলিশ গবেষক ও মৎস্যবিজ্ঞানী ড. আনিছুর রহমান জানান, মৌসুমের এই সময় পরিভ্রমণশীল ইলিশ গভীর সাগর থেকে সাগর, মোহনা ও পাশের নদীতে ঝাঁক বেঁধে ছুটে আসে। এবারও প্রচুর ইলিশ ধরা পড়বে। জেলেদের একটু ধৈর্য ধরার আহবান জানান তিনি।

কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, সাগর উত্তাল থাকায় কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মহেশখালী, বাঁশখালী ও কুতুবদিয়া অঞ্চলের মাছ ধরার শত শত ট্রলার তীরে আশ্রয় নিয়েছে, যদিও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেই ইলিশ শিকারের আশায় সাগরে গিয়েছিলেন জেলারা। কিন্তু মৌসুমের শুরুতেই খালি হাতে ফেরায় চিন্তার ভাঁজ পড়েছে জেলেদের কপালে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শিববাড়িয়া নদীর দুই তীরে শত শত ট্রলার নোঙর করা রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, উত্তর বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে। এর প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। সমুদ্রবন্দরসহ চারটি বন্দরকে ৩ নম্বর সতর্কতা সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, জেলেরা ইলিশ পাচ্ছেন, কিন্তু আকারে ছোট। হাতিয়ার মেঘনা নদী হচ্ছে এ অঞ্চলের জেলেদের মৎস্য আহরণের একমাত্র স্থান। এ ছাড়া কোম্পানীগঞ্জ উপজেলাসংলগ্ন নদীতে জেলেরা ইলিশ শিকার করেন।

হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অনিল চন্দ্র দাস বলেন, ‘হাতিয়া, সুবর্ণচর ও কোম্পানীগঞ্জে ১৫ হাজার জেলে রয়েছে। এখানে ছোট-বড় প্রায় ৫০টি ঘাটে মাছ ওঠে। মৌসুম শুরু হয়েছে মাত্র। এবার আমরা ভালো মাছ পাব বলে আশা করছি।’

শরণখোলা (বাগেরহাট) প্রতিনিধি জানান, উত্তাল ঢেউয়ের কারণে বঙ্গোপসাগরে জাল ফেলতে পারছেন না জেলেরা। ফলে চরম হতাশ হয়ে পড়েছেন শরণখোলার জেলে-মহাজনরা।

শরণখোলার তিন শতাধিক ট্রলার বরগুনার মহিপুর, সখিনা এবং পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী, মেহের আলী ও ডিমের চর এলাকায় নোঙর করা রয়েছে।

বাগেরহাট জেলা ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেন বলেন, ‘সাগরে তীব্র ঢেউ। এর মধ্যে জাল ফেলা সম্ভব নয়।’ তিনি জানান, এক ট্রিপে (আট থেকে ১০ দিন) একেকটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে পাঁচ থেকে সাত লাখ টাকা খরচ হয়। এরই মধ্যে প্রায় চার দিন পার হয়ে গেছে। প্রথম ট্রিপের সব খরচই লোকসান হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।



সাতদিনের সেরা