kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৫ কার্তিক ১৪২৮। ২১ অক্টোবর ২০২১। ১৩ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

অরক্ষিত উপকূল ১

ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতি তিন লাখ কোটি টাকা

মুস্তফা নঈম, চট্টগ্রাম   

২৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বৈশ্বিক ঊষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেই বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের অগ্নিমুখে রয়েছে বাংলাদেশ। ২০০০ সালের পর থেকে প্রতিবছরই দেশের ৭১১ কিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। মারাত্মক ঝুঁকিতে থাকা এসব এলাকায় সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে গত ২০ বছরে সামগ্রিক ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কোনো হিসাব নেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে। তবে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার তথ্য বলছে, এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা।

প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, ২০০০ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশের উপকূলীয় এলাকায় ১০টি সামুদ্রিক ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস আঘাত হেনেছে। প্রতিটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পর জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা উপকূলভিত্তিক নানা প্রকল্প প্রণয়নে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ণয় করে থাকে। বিভিন্ন সংস্থার আলাদাভাবে নিরূপণ করা এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিন লাখ কোটি টাকা। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও মনে করেন, আর্থিক ক্ষতির এই পরিসংখ্যান যৌক্তিক।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের একজন উপপরিচালক বলেন, দেশের উপকূলীয় এলাকায় সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা যে আর্থিক ক্ষতি নিরূপণ করে থাকে তা থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা বিভাগ সহযোগিতা নিয়ে থাকে। তবে গত ২০ বছরে যে পরিমাণ ক্ষতির কথা বলা হচ্ছে তা কিছুটা কমবেশি হতে পারে।

দেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি নিরূপণে ২০০০ সাল থেকে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা কেয়ার বাংলাদেশের তত্ত্বাবধানে বেশ কিছু সংস্থা কাজ করেছে। এসব উন্নয়ন সংস্থা সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ছাড়াও বন্যা, নদীভাঙনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির বিষয় তুলে ধরেছে। সংস্থাগুলো হলো জয়েন্ট নিড অ্যাসেসমেন্ট (জেএনএ), নিড অ্যাসেসমেন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ (এনএডাব্লিউজি), নিরাপদ ও  হিউম্যানিটারিয়ান কো-অর্ডিনেশন টাস্ক টিম (এইচসিটিটি)। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় সচিবের কার্যালয় ও জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধির অফিস এসব সংস্থার কাজ সরাসরি তত্ত্বাবধান করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

কেয়ারেরর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত জরিপ তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫ সালে কোমেনের কারণে ১.২ মিলিয়ন, ২০১৬ রোয়ানুতে ৬.৫ মিলিয়ন, ২০১৭ সালে মোরায় ৭.৭ মিলিয়ন এবং ২০২০ সালে আম্ফান ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে ১২.৬ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

এশিয়ান ডিজাস্টার রিডাকশন সেন্টার (এডিআরসি) ২০০৭ সালে সিডরে ২.৩ বিলিয়ন ডলার এবং ২০০৯ সালে আইলায় ২৭০ মিলিয়ন ডলার আর্থিক ক্ষতির উল্লেখ করেছে। তাদের হিসাবে ১৯৯১ সালের এপ্রিলে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের তথ্যও রয়েছে। ওই ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ১.৭৮ বিলিয়ন ডলার।

এসব সংস্থার তালিকায় ২০০৮ সালে নার্গিস এবং ২০১৩ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ নেই। অন্য কোনো সূত্র থেকেও এই দুটি ঝড়ের ক্ষতির তথ্য পাওয়া যায়নি।  

ইউএন ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশনের (ইউএনডিআরআর) তত্ত্বাবধানে উপকূলীয় এলাকার ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নিয়ে করা জরিপ এবং জাতিসংঘের দুর্যোগবিষয়ক একটি ব্লগে ২০২১ সালে প্রকাশিত যৌথ গবেষণায় ভয়াল পাঁচটি ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতির তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সিডরে এক হাজার ৫২১ মিলিয়ন ডলার, আইলায় এক হাজার মিলিয়ন ডলার এবং আম্ফানে ৩৭৫ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির উল্লেখ রয়েছে। এই তিনটি ঝড়ে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দুই হাজার ৮৯৬ মিলিয়ন ডলার।

তাদের এই যৌথ গবেষণায় ১৯৭০ সালের ভয়াবহ সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাস, যা ভোলা সাইক্লোন নামে পরিচিত, তাতে ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে ৮৬৪ মিলিয়ন ডলার। আর ১৯৯১ সালের গোর্কি নামের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতির পরিমাণ দুই হাজার ২৮০ মিলিয়ন ডলার।

এদিকে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে ২০১৬ সাল থেকে ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় জনপদে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হয়েছে। ব্যাপকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ হওয়া সত্ত্বেও দেশে সরকারি পর্যায়ে এককভাবে এমন উদ্যোগ এটাই প্রথম।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয় থেকে চারটি সামুদ্রিক ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখ করা হয়েছে প্রায় আট হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২০১৬ সালে রোয়ানুতে এক হাজার ১২৬ কোটি ৮০ লাখ ৩৫ হাজার ৪৫৪ টাকা, ২০১৯ সালে বুলবুলে চার হাজার চার কোটি ৬৭ লাখ ৯২ হাজার ৫০৯ টাকা, ২০১৯ সালে ফণীতে ২৬৭ কোটি ৫৭ লাখ ৮২ হাজার ৯৬৪ টাকা ৪৪ পয়সা এবং ২০২০ সালে আম্ফানে তিন হাজার ১৭২ কোটি ১৬ লাখ ৬৪ হাজার ৯১৩ টাকা ৪৪ পয়সা।



সাতদিনের সেরা