kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

ইকোসাইড বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে

প্রয়োজনে নতুন আইন চায় সংসদীয় কমিটি
জেনোসাইডের মতো অপরাধ ইকোসাইড

নিখিল ভদ্র   

২৭ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ইকোসিস্টেম (বাস্তুতন্ত্র) ধ্বংসকে জেনোসাইডের (গণহত্যা) মতো অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংসদীয় কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে ইকোসিস্টেম ধ্বংসকে (ইকোসাইড) মানবজাতির জন্য হুমকি উল্লেখ করে তা বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এসংক্রান্ত অপরাধের বিচার বিদ্যমান ফৌজদারি কার্যবিধিতে করা যায় কি না, তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এমনকি প্রয়োজনে নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ইকোসিস্টেম বা বাস্তুতন্ত্র হচ্ছে জীবজগতের স্বাভাবিক বাসস্থান ও জীবনচক্র। কিন্তু ইকোসিস্টেম নিয়ে উদ্বিগ্ন পরিবেশবাদীরা। জনসংখ্যার উচ্চহারের সঙ্গে উচ্চ ফলনের জোগান, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং মারাত্মক দূষণের কারণে ইকোসিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে। কোনো কারণে পরিবেশের উপাদান—পানি, বায়ু ও মাটির স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যের পরিবর্তন হলে পরিবেশের দূষণ ঘটে। আর এ ধরনের দূষণের নানা ভৌত, রাসায়নিক ও জীবজাগতিক কারণগুলো পরিবেশের স্বাভাবিকতা নষ্ট করে। ফলে যেকোনো ইকোসিস্টেম নষ্ট হয়। এতে জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়।

একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ তার প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে ভূমিকে পরিবর্তন করছে। কৃষিকাজ, গৃহায়ণ, রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণ, শিল্প-কারখানা স্থাপন এবং বালু-পাথর দিয়ে নিম্ন জলাভূমি ভরাটের কারণে প্রতিনিয়ত ভূমির পরিবর্তন হচ্ছে। এতে সেই স্থানের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের বাসস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একইভাবে আগ্রাসী ও ভিনদেশি প্রজাতি প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে ইকোসিস্টেম ধ্বংস হচ্ছে। ইকোসিস্টেম ধ্বংসের কারণে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। এই প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকলে অপরিসীম ক্ষতির মুখে পড়বে পুরো মানবজাতি। যে কারণে ইকোসিস্টেম ধ্বংসকেও গণহত্যার মতো অপরাধ হিসেবে দেখছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। যা নিয়ে কমিটির বৈঠকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।

কমিটিসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবসহ নানা কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশে ইকোসিস্টেম নষ্ট হচ্ছে। বনজসম্পদ নিধন, বনভূমি দখলের প্রবণতা, সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকার উপকূল ভাঙন, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর নাব্যতা সংকটের কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। হাওর দখল এবং হাওরের জীববৈচিত্র্যকে বিভিন্নভাবে নষ্ট করা হচ্ছে। পাহাড় কেটে ও বন উজাড় করে আবাসন তৈরি করা হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত শিল্পায়ন বা অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণের ফলে অনেক অঞ্চলের উর্বর মাটির উপরিভাগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রকৃতিবিরোধী আগ্রাসনের কারণে টেকনাফের ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়েছে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়েছেন সংসদীয় কমিটির সদস্যরা।

সংসদীয় কমিটির বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, গত ২০ জুন অনুষ্ঠিত বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। আলোচনাকালে কমিটির সদস্যরা ইকোসাইড বন্ধে জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রতি একমত প্রকাশ করেন কমিটির সদস্যরা। তাঁরা ইকোসিস্টেম ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। সে ক্ষেত্রে এই অপরাধে জড়িতদের ফৌজদারি কার্যবিধিতে (সিআরপিসি) বিচারের সুযোগ আছে কি না, তা যাচাই-বাছাই করে দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেটা সম্ভব না হলে বিদ্যমান আইনের সংস্কার বা নতুন আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়।

এ বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইকোসাইডকে সাধারণভাবে কোনো অঞ্চলের স্বাভাবিক প্রকৃতি ও পরিবেশের ধ্বংস হয়ে যাওয়া কিংবা বাস্তুতন্ত্রের ক্ষতি হিসেবে বোঝানো হয়। তাই গণহত্যার মতো ইকোসিস্টেম ধ্বংস করাকেও একই ধরনের অপরাধ বলে আমরা মনে করি। কারণ ইকোসিস্টেম না থাকলেও আমরা কেউই বাঁচতে পারব না। এ জন্য প্রতিবেশের বিরুদ্ধে যে অপরাধগুলো হচ্ছে, সেগুলোকে আইনের আওতায় আনাই ইকোসাইডের মূল থিম। আমরা ইকোসাইডকে ক্রাইম হিসেবে দেশি আইনের এখতিয়ারভুক্ত করার কথা বলেছি। এ ক্ষেত্রে সিআরপিসিতে এটা অন্তর্ভুক্ত করা যায় কি না বা নতুন কোনো আইন করা সম্ভব কি না, সেটা দেখতে বলেছি।’

এ বিষয়ে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু মন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সংসদীয় কমিটির সুপারিশটি গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে আমাদের ইকোসিস্টেম রক্ষায় এরই মধ্যে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পরিবেশ ধ্বংসের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে। এর পরও সংসদীয় কমিটির প্রস্তাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে। নিয়মানুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’



সাতদিনের সেরা