kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী

ছড়িয়ে পড়েছিল দেশে দেশে

বাংলাদেশের প্রথম স্মারক ডাকটিকিট

আজিজুল পারভেজ   

২৬ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ছড়িয়ে পড়েছিল দেশে দেশে

মাতৃভূমির স্বাধীনতার জন্য লড়াই চলছে যেমন রণাঙ্গনে, তেমনি নানা অঙ্গনে। ওই সময়ে একটি লড়াকু জাতির অস্তিত্ব ঘোষণা করে দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ল একটি ছোট স্মারক। ডাকটিকিট। দখলদার রাষ্ট্র পাকিস্তান আপত্তি জানাল। কিন্তু কোনো কাজ হলো না। বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশের আজ সুবর্ণ জয়ন্তী। ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল স্মারক ডাকটিকিট। প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশের প্রথম সরকার মুজিবনগর সরকার।

প্রকাশিত হয়েছিল চার রঙের আটটি ডাকটিকিটের একটি সিরিজ। আকার ছিল ৩৯ী২৫.৫ মিমি। প্রতিটি ডাকটিকিটে বড় অক্ষরে লেখা ছিল বাংলা ও ইংরেজিতে ‘বাংলাদেশ’। প্রতিটি সেটে ৫০টি ডাকটিকিট ছিল।

লিটোগ্রাফি মাধ্যমে ডাকটিকিটের নকশা করেছিলেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গের গ্রাফিকসশিল্পী অধ্যাপক বিমান মল্লিক। তিনি তখন লন্ডনের কেন্টেরফোক স্টোন স্কুল অব আর্ট এবং এসেক্সের হারলো টেকনিক্যাল কলেজের অধ্যাপনায় নিয়োজিত। ডাকটিকিটের সঙ্গে ছিল ফাস্ট-ডে কভার। কভারের ওপর বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, জন স্টোনহাউস ও বিমান মল্লিকের অটোগ্রাফ ছিল।

বাংলাদেশের প্রথম ডাকটিকিট প্রকাশ সম্পর্কে জানা যায়, আইডিয়াটি বাংলাদেশ অনুরাগী একজন ব্রিটিশ এমপির মাথায় প্রথম এসেছিল। তিনি ব্রিটিশ ডাক ও টেলিযোগাযোগ দপ্তরের সাবেক মন্ত্রী ও লেবার পার্টির পার্লামেন্ট সদস্য জন স্টোনহাউস। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শেষ দিকে স্টোনহাউস বাংলাদেশের শরণার্থীদের অবস্থা দেখতে পশ্চিমবঙ্গের কলকাতায় আসেন। তিনি স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং বাংলাদেশের ডাকটিকিট প্রকাশের প্রস্তাব করেন। তিনি বলেন, মুক্তাঞ্চলে ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশের ডাকটিকিট প্রচলন করা হলে চিঠিপত্রের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিশ্বের কাছে তুলে ধরা সহজ হবে। তাজউদ্দীন প্রস্তাবটি গ্রহণ করে এসংক্রান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সব দায়িত্ব স্টোনহাউসকে দেন।

স্টোনহাউস লন্ডন ফিরে বিমান মল্লিককে বাংলাদেশের জন্য ডাকটিকিটের নকশা তৈরির অনুরোধ জানালে তিনি সাগ্রহে তা গ্রহণ করেন। স্টোনহাউস মন্ত্রী থাকাকালে বিমান মল্লিক ব্রিটিশ পোস্ট অফিসের জন্য গান্ধী স্মারক ডাকটিকিটের নকশা তৈরি করে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। শিল্পী ছয় সপ্তাহের মধ্যে বাংলাদেশের ডাকটিকিটের নকশা চূড়ান্ত করেন। এ জন্য কোনো পারিশ্রমিক নেননি। ব্রিটেনের সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ওয়ার অন ওয়ান্টের চেয়ারম্যান ডোনাল্ড চেসওয়ার্থ ডাকটিকিটের নকশাগুলো নিয়ে লন্ডন থেকে কলকাতায় আসেন এবং বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদন নিয়ে যান। স্টোনহাউস ডাকটিকিটগুলো লন্ডনের ফরমাল ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেস থেকে ছাপানোর ব্যবস্থা করেন।

১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই লন্ডনের হাউস অব কমন্সের হারকোর্ট কক্ষে আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী স্বাধীন বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ডাকটিকিট ও ফাস্ট-ডে কভার প্রদর্শন করেন। জন স্টোনহাউস কক্ষটি তাঁর নামে বরাদ্দ করিয়ে নিয়েছিলেন। প্রকাশনা উৎসবে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সব দলের বেশ কিছু সদস্য উপস্থিত ছিলেন। পিটার শোর, স্টোনহাউসসহ কয়েকজন এমপি বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রতি সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। বিমান মল্লিক ডাকটিকিটগুলোর তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন। এরপর ২৯ জুলাই ব্রিটিশ পার্লামেন্টের একটি কক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানে নতুন ডাকটিকিট ও ফাস্ট-ডে কভার বিক্রি শুরু হয়। বাংলাদেশের একজন ব্যবসায়ী ডাকটিকিটের প্রথম সেট ও ফার্স্ট-ডে কভার ২৩০ পাউন্ডে এবং আরেক বাঙালি দ্বিতীয় সেট ২২০ পাউন্ড দিয়ে কেনেন। প্রথম দিন বিক্রি করে প্রায় এক হাজার পাউন্ড সংগৃহীত হয়।

একই দিন কলকাতায় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রবাসী সরকার ডাকটিকিটের প্রকাশনা উৎসবের আয়োজন করে। বাংলাদেশ মিশন কার্যালয়ে ডাকটিকিট বিক্রয় কাউন্টার খোলা হয়। ভারতের অন্যান্য রাজ্য, উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশেও আনুষ্ঠানিকভাবে একযোগে এগুলো প্রকাশিত ও বিক্রয় শুরু হয়। নতুন ডাকটিকিট প্রকাশের সংবাদ ভারত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত সৃষ্টিতে সহায়ক হয় এবং বিভিন্ন দেশের সরকার, সংবাদপত্র ও ফিলাটেলিস্টদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে। পাকিস্তান সরকার সুইজারল্যান্ডে ইন্টারন্যাশনাল পোস্টাল ইউনিয়নের সদর দপ্তরে এই ডাকটিকিটের ব্যাপারে প্রচণ্ড আপত্তি জানিয়ে তা বেআইনি ঘোষণার আবেদন করে। তবে বহু দেশ ডাকটিকিটগুলোর ব্যবহার শুরু করে। মুক্তাঞ্চল থেকে পাঠানো চিঠিপত্রে নতুন ডাকটিকিট ব্যবহৃত হতে থাকে। এ সময় মুক্তাঞ্চলে একটি পোস্ট অফিস স্থাপন করা হয়।

ডাকটিকিটগুলো ছিল ১০ পয়সা থেকে ১০ টাকা মূল্যমানের। ৫ টাকা মূল্যমানের ডাকটিকিটে ছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি। ১০ টাকা মূল্যমানের ডাকটিকিট ছিল ‘বাংলাদেশকে সমর্থন করুন’ শীর্ষক বাংলাদেশের মানচিত্র।

যুদ্ধরত একটি জাতির পক্ষ থেকে ডাকটিকিট প্রকাশ, প্রচারের ঘটনা বিশ্বের মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা।



সাতদিনের সেরা