kalerkantho

সোমবার । ৯ কার্তিক ১৪২৮। ২৫ অক্টোবর ২০২১। ১৭ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীর সংকট সেবা কাজে বিপদের শঙ্কা

খুলনার রোগীদের ভরসা বেসরকারি অক্সিজেন ব্যাংকগুলো

কৌশিক দে, খুলনা   

৮ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবীর সংকট সেবা কাজে বিপদের শঙ্কা

“শুক্রবার (২ জুলাই) জুমার নামাজের পর খুলনা অক্সিজেন ব্যাংকের কর্মীরা যে সিলিন্ডার রোগীর জন্য বাসায় দিয়ে গেলেন সেটি চলল রাত ১০টা পর্যন্ত। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল শেখ সোহেল অক্সিজেন ব্যাংকের প্রধান সমন্বয়কারী ও জেলা পরিষদ সদস্য চৌধুরী রায়হানের কথা। রাত পৌনে ১১টায় মোবাইলে ফোন দিতেই রায়হান ফরিদ বললেন, ‘ভাই এখনই পাঠাচ্ছি।’ কিছু বাদে অক্সিজেন সিলিন্ডার নিয়ে এলেন চার কর্মী। ওটাও শেষ হলে আবার ফোন দিই। শেখ সোহেল অক্সিজেন ব্যাংকের কর্মীরা রাত ১টা ৫৮ মিনিটে আবার আরেক সিলিন্ডার নিয়ে এলেন। তাঁরা বলে গেলেন, ‘যতবার প্রয়োজন ততবার আমরা সিলিন্ডার নিয়ে আসব।’ ভোর সাড়ে ৫টায় অক্সিজেনের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেল। আমার বৃদ্ধ শাশুড়ি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।”

বেসরকারি অক্সিজেন ব্যাংকের নিঃস্বার্থ সেবা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে এভাবেই লিখেছেন খুলনা জজকোর্টের আইনজীবী ফরিদ আহমেদ। তাঁর মতো শত শত মানুষের ভরসা হয়ে দাঁড়িয়েছে খুলনায় বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গড়ে ওঠা অক্সিজেন ব্যাংকগুলো। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা দিন-রাত ছুটে বেড়াচ্ছেন মুমূর্ষু রোগীর বাড়ি বাড়ি। তাঁদের অক্সিজেন সিলিন্ডারে বেঁচে যাচ্ছে অনেক প্রাণ। কিন্তু আর্তমানবতার সেবায় ছুটে চলা এসব তরুণের অনেকের যথাযথ প্রশিক্ষণ না থাকায় বিপন্ন হতে পারে রোগীর জীবন। ফলে এই স্বেচ্ছাসেবীদের যথাযথ প্রশিক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে। অক্সিজেন ব্যাংক পরিচালনাকারীরাও বিজ্ঞানভিত্তিক উপায়ে সাধারণ মানুষের শতভাগ সেবা নিশ্চিত করতে চান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনা মহানগরীসহ জেলার পাড়া-মহল্লায় বেসরকারি উদ্যোগে ২০-২১টির মতো অক্সিজেন ব্যাংক গড়ে উঠেছে। তাদের অনেকেই এক বছরের বেশি সময় ধরে করোনা আক্রান্ত রোগীদের সেবায় কাজ করছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান খুলনা অক্সিজেন। এই ব্যাংকের মাধ্যমে এ পর্যন্ত দেড় হাজারেরও বেশি মানুষ অক্সিজেন সেবা পেয়েছে। অক্সিজেন সেবা নিয়ে এ ছাড়াও কাজ করছে যুবলীগের কেন্দ্রীয় প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সোহেলের পৃষ্ঠপোষকতায় শহীদ শেখ আবু নাসের অক্সিজেন ব্যাংক, শেখ সোহেল অক্সিজেন ব্যাংক, রোটারি খুলনা অক্সিজেন সিলিন্ডার প্রকল্প, বিএনপি কল সেন্টার, বিএনপি নেতা বকুলের গণমানুষের স্বাস্থ্যসেবা ও করোনা সাপোর্ট সেন্টার, মহানগর ও জেলা পূজা উদযাপন কমিটির অক্সিজেন সাপোর্ট সেন্টার, উদীয়মান অক্সিজেন ব্যাংক, সেভ দ্য ফাউন্ডেশন, বাঁধন ব্লাড ব্যাংক, বিল্ড খুলনা অক্সিজেন ব্যাংক, গোল্ডেন জেনারেশন অব খুলনা জিলা স্কুল, আল কারীম অক্সিজেন সেবা, রূপসার আলো ফুটবেই অক্সিজেন সেবা, ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া অক্সিজেন ব্যাংক, পাইকগাছার অক্সিজেন ব্যাংক ইত্যাদি।

খুলনা অক্সিজেন ব্যাংকের সভাপতি সালেহ উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘আমাদের প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকরা জীবনের মায়া উপেক্ষা করে সেবা দিয়ে চলেছে। আমরাও মনে করি অক্সিজেন ব্যবহার বিষয়ে প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’

সেফ দ্য ফাউন্ডেশনের খুলনা নগর সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাত হোসেন প্রিন্স বলেন, ‘অক্সিজেন ব্যবহার ও করণীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ জরুরি। বিষয়টি মাথায় রেখে আজ (বুধবার) আমরা তিনটি সংগঠন বিএমএর মাধ্যমে প্রশিক্ষণ নিচ্ছি। নতুন স্বেচ্ছাসেবক তৈরিতে এই ধারাবাহিকতা রাখা হবে।’

স্বজন হারানো অ্যাডভোকেট ফরিদ আহমেদ বলেন, ‘আমার মতো কত শত মানুষের নির্ঘুম রাতের সঙ্গী স্বেচ্ছাসেবী অক্সিজেন-যোদ্ধারা। তাঁরা না থাকলে খুলনায় লাশ দাফনেরও জায়গা হতো না। তাঁদের অনেকেই ইতিমধ্যে ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অন্যদেরও প্রশিক্ষণ নেওয়াটা জরুরি।’

বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বলছেন, অক্সিজেন যেমন জীবন বাঁচায় তেমনি মৃত্যুও ঘটায়। করোনা আক্রান্ত বা মুমূর্ষু রোগীদের অক্সিজেন দেওয়ার ক্ষেত্রে শরীরের অক্সিজেন মাত্রা ও প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অক্সিজেন কমে যাওয়াটা যেমন মৃত্যুর কারণ, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত অক্সিজেন রোগীর ফুসফুসকে অকেজো করে দিয়ে মৃত্যু ঘটাতে পারে।

খুলনা মেডিক্যাল কলেজের উপাধ্যক্ষ ও বিএমএ খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক ডা. মেহেদী নেওয়াজ বলেন, ‘অক্সিজেন গ্রহণের ক্ষেত্রে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। অনেক স্বেচ্ছাসেবী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তাঁদেরকে উত্সাহিত ও দক্ষ করে গড়ে তোলা জরুরি।’

বিএমএ খুলনা জেলার সভাপতি ডা. শেখ বাহারুল আলম বলেন, ‘রোগীর শরীরে অক্সিজেন প্রয়োগ কম-বেশি হলে বড় বিপদ ঘটতে পারে। হাই ফ্লো ন্যাজাল ক্যানুলার মাধ্যমে প্রতি মিনিটে ৫০-৬০ লিটার অক্সিজেন দেওয়া হয়। কোনো রোগীর হাই ফ্লো নাজাল ক্যানুলা প্রয়োজন হলে সিলিন্ডার অক্সিজেন সাপোর্ট কাজে আসবে না। বরং আরো চাহিদা সৃষ্টি করবে। স্বেচ্ছাসেবী তরুণদের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তাদের দক্ষ করে তুলতে ইতিমধ্যে আমরা কাজ শুরু করেছি। তবে এ বিষয়ে রাষ্ট্রের উদ্যোগটাও জরুরি।’

খুলনার সিভিল সার্জন ডা. নিয়াজ মোহাম্মদ বলেন, ‘দক্ষ ব্যক্তি ছাড়া অক্সিজেন পরিচালনা করতে পারেন না। স্বেচ্ছাসেবী অনেকের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তার পরও আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখব।’



সাতদিনের সেরা