kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৬ মাঘ ১৪২৮। ২০ জানুয়ারি ২০২২। ১৬ জমাদিউস সানি ১৪৪৩

টাঙ্গাইলে অ্যাম্বুল্যান্স-পিকআপ সংঘর্ষ

ছোট্ট মাহি জানে না মা-বোন বেঁচে নেই

ক্যান্সার আক্রান্ত ফরিদার সহযাত্রী ছিল দুই মেয়ে ও বড় বোন

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



চট্টগ্রাম মহানগরীর ডবলমুরিং থানার আগ্রাবাদ সিডিএ ১ নম্বর সড়কের বলিপাড়ায় আমিনুল হক মেম্বার বাড়ি। পাকা ভবনের তৃতীয় তলায় একটি ফ্ল্যাটের দরজা বন্ধ। ভেতরে সুনসান নীরবতা। দোতলার ফ্ল্যাট ও সামনের বাড়ির অন্দরমহল থেকে আসছে নারীদের ডুকরে কান্নার শব্দ।

ঘরের সামনে পৌঁছতেই বেরিয়ে এলেন কয়েকজন পুরুষ সদস্য। তাঁদের একজন তৌহিদুল আলম বললেন, ‘আমার চাচি ফরিদা বেগম ক্যান্সার আক্রান্ত ছিলেন। চিকিৎসা নিচ্ছিলেন সিরাজগঞ্জের একটি হাসপাতালে। চিকিৎসাও প্রায় শেষ পর্যায়ে চলে এসেছিল। এবার গিয়েছিলেন শেষ দফার কেমো ও পরে রেডিওথেরাপি দিতে। সে জন্য সিরাজগঞ্জে মাসখানেক থাকার পরিকল্পনা ছিল। তাই দুই মেয়ে ও বড় বোনকে নিয়ে গত শুক্রবার রাতে যাত্রা শুরু করেছিলেন চট্টগ্রাম থেকে। কিন্তু টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে তাঁদের বহনকারী অ্যাম্বুল্যান্সের সঙ্গে পিকআপের সংঘর্ষ সব কিছু ওলটপালট করে দিয়েছে। চাচি, তাঁর বড় মেয়ে আকসা আলম মারিয়া (১৬) ও বোনকে কেড়ে নিয়েছে ওই দুর্ঘটনা। আর ছোট মেয়ে মাহিয়া মাহি (৯) ঢাকার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ওদিকে কুয়েতপ্রবাসী চাচা মোরশেদ আলম দেশে আসার জন্য বিমানের টিকিটের অপেক্ষায়।’

মোরশেদ আলমের ভাতিজা ইব্রাহীম বলেন, ‘আজ (গতকাল রবিবার) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মাহির জ্ঞান ফিরেছে। সে মাকে খুঁজছে। সে এখনো জানে যে মা-বোন আর বেঁচে নেই। মাহির পাশে থাকা মামাও ছোট্ট শিশুটিকে এই খবর দিতে পারেননি। দুর্ঘটনায় আহত মাহি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে কেঁদে কেঁদে মাকে ডাকছে। চাচাও এই চরম  দুঃসময়ে ছোট্ট মাহির পাশে নেই।’

এ প্রতিবেদক গতকাল স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার একটু আগেই দুপুরে আগ্রাবাদ এলাকায় তিনজনের জানাজা একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। এরপর মা-মেয়েকে বলিপাড়া মসজিদসংলগ্ন কবরস্থানে এবং ফরিদার বড় বোন ফেরদৌস বেগমের (৪০) মরদেহ মুন্সিপাড়া কবরস্থানে দাফন করা হয়।

জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়া মানুষগুলোও ছিল শোকে কাতর। ফরিদা বেগমের আত্মীয় মো. নুরুচ্ছফা বললেন, ‘স্বপ্নেও ভাবিনি এভাবে একসঙ্গে তিনজনের জানাজা পড়তে হবে। আশা করেছিলাম উনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন। কিন্তু ফিরলেন লাশ হয়ে। আগে কখনো মেয়েদের সঙ্গে নিয়ে চিকিৎসার জন্য যাননি। কিন্তু এবার কিছুদিন ওখানে থাকার পরিকল্পনা থেকেই দুই মেয়েকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। কী দুর্ভাগ্য, পুরো সংসার তছনছ হয়ে গেল।’

জানা গেল, গত শুক্রবার রাতে চট্টগ্রাম থেকে একটি অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করে তারা চারজন ঢাকায় পৌঁছে। এরপর ঢাকা থেকে অন্য একটি অ্যাম্বুল্যান্সে তারা সিরাজগঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করে। মারিয়া হাতেখড়ি স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিল। মাহি দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। আর ফরিদার বড় বোন ফেরদৌস বেগম দুই সন্তানের জননী।

অ্যাম্বুল্যান্সটি শনিবার সকাল ৭টায় ঢাকা-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কে কালিহাতী উপজেলা অতিক্রম করে সিরাজগঞ্জের দিকে যাওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা পিকআপের সঙ্গে মুখোমুখি সংঘর্ষে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে তিনজনই চট্টগ্রামের মা-মেয়ে ও বোন। মরদেহগুলো শনিবার শেষ রাতে চট্টগ্রামে পৌঁছে।



সাতদিনের সেরা