kalerkantho

শনিবার । ১২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৭ নভেম্বর ২০২১। ২১ রবিউস সানি ১৪৪৩

সরেজমিন কড়াইল বস্তি

‘সরকাররে কন আমাগো খাওন দিব’

জহিরুল ইসলাম   

৫ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রিকশাচালক ফরহান মিয়া (৫৫) এক যুগের বেশি সময় ধরে থাকেন কড়াইল বস্তির বেলতলা আদর্শনগরে। ১৪ বাই ১৪ ফুটের এক কক্ষে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে বাস। বৃদ্ধা মা আর ১০ বছরের মেয়ে গেন্দাকে নিয়েই তাঁর বেশি চিন্তা। বয়সের ভারে চলতে-ফিরতে পারেন না মা আর একমাত্র মেয়েটি শারীরিক প্রতিবন্ধী। ছেলে ছোট। ফলে পরিবার চলে তাঁর রোজগারে। তবে কঠোর বিধি-নিষেধে সড়কে লোকজন কমে গেছে। ফলে তাঁর আয়েও কোপ পড়েছে।

গতকাল রবিবার বিকেলে কড়াইল বস্তিতে এক কক্ষের টিনশেড ঘরের সামনে বসে ছিলেন ফরহান মিয়া। পাশেই মেয়ে গেন্দা। কোনো ত্রাণ পেয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাই, এক ছটাক চাইলও কেউ দেয় নাই। দুই শ টাকা রিকশার জমা দেওন লাগে। একটা টাকাও কম লয় না। সারা দিন গাড়ি চালাইয়া এক-দেড় শ টাকাও থাহে না। রাস্তায় লোকজন নাই তো। ঘরের মইধ্যে আমিসহ পাঁচজন মানুষ।’ ফরহান মিয়া আরো বলেন, ‘মাইয়াটা প্রতিবন্ধী। মা নড়তে-চড়তে পারে না। ঠিকমতো ওষুধও খাওয়াইতে পারি না। আমাগো চলা মুশকিল।’

অর্ধযুগের বেশি সময় কড়াইল বস্তিতে আছেন শেফালী। বিয়ে হয়েছে তাঁর বস্তির শেখ ফরিদ নামে এক যুবকের সঙ্গে। ফরিদ একটি বেসরকারি অফিসের পিয়নের কাজ করতেন। কিন্তু করোনায় অফিস বন্ধ থাকায় কর্মহীন হয়ে ফরিদ বাসায়। তিনি বলেন, ‘কাজ কইরা খাই। অনেক দিন কাজ নাই। ঘর ভাড়ার আড়াই হাজার টাকাও দিতে পারি নাই। ছোট বাচ্চাটা নিয়ে কষ্টে আছি।’

কড়াইল বস্তির অন্তত ১০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বছর লকডাউনের শুরুর দিকে যে পরিমাণ সাহায্য-সহযোগিতা পেয়েছেন তাঁরা, এবার তার কানাকড়িও পাননি। তবু আশা ছাড়েননি তাঁরা। বৃদ্ধা রহিমা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দরজার সামনে বসে থাকেন। তিনি জানান, কেউ ত্রাণ নিয়ে এলে যাতে অবশ্যই পান, সে জন্য বেশির ভাগ সময় দরজার সামনে বসে থাকেন। রহিমা বলেন, ‘কারো কাম নাই। আরো দুই দিন হয়তো চলব। গেল বার আশপাশের বাড়িওলারাও চাউল-ডাউল-সাবান দেছিল। এইবার কিচ্ছু নাই। খামু কী! সরকাররে কন আমাগো খাওন দিব।’

রহিমার সঙ্গে কথা বলতে বলতে বস্তির অন্য একটি ঘর থেকে আরো কয়েকজন বের হয়ে এলেন। কিছু বলার আগেই নিজেদের নাম-ঠিকানা বলতে শুরু করেন। তাঁরা বলেন, ভেবেছিলেন ত্রাণ দেওয়ার জন্য তালিকা করা হচ্ছে। সাঈদা নামে একজন বলেন, ‘বস্তিতে আগুন লাগলেও দেখতাম আগে মানুষ ত্রাণ নিয়া আইত। এই বছর আবার লকডাউন আইল, পুলাপাইনডি এইবার এক্কেরে বহা। কারো কামাই নাই। বাসাবাড়িতে লোক রাহে না। ক্যামনে চলি?’

তবে কড়াইল বস্তিতে কঠোর বিধি-নিষেধের কোনো ছাপ নেই। সড়কের পাশের বেশির ভাগ দোকানপাট খোলা। হোটেলগুলোতে বসেই খাবার খাচ্ছে বাসিন্দারা। মুদি দোকান, সেলুন—সব দোকানেই চলছে আড্ডাবাজি। সড়কে এবং বস্তির অলিগলিতে বেশির ভাগ মানুষের মুখে মাস্কও নেই। জানা যায়, বস্তির বাসিন্দাদের অনেকেই লেগুনা, বাসের হেলপার অথবা দোকানে কাজ করে। কাজ নেই, তাই বস্তির ছোট ঘরে বসে না থেকে আশপাশে ঘুরেফিরে আড্ডা দিয়ে সময় কাটাচ্ছে। নারীদেরও অনেকে বাইরে বসে গল্প করছেন। তবে যাঁর সঙ্গেই কথা হয়েছে, প্রত্যেকে তাঁদের কষ্টের কথা জানান এই প্রতিবেদককে।

কড়াইল বস্তিটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ২০ নম্বর ওয়ার্ডে পড়েছে। ত্রাণ বিতরণ নিয়ে স্থানীয় কাউন্সিলর মো. নাছির কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গত বছর করোনার শুরুতে বিভিন্ন সংস্থা, সিটি করপোরেশন সরকারের নির্দেশনায় মানুষকে সহায়তা করেছে। এবার এ রকম কোনো কিছু করতে পারিনি। কারণ সিটি করপোরেশন বা সরকারের কোনো নির্দেশনা পায়নি কেউ। পেলে হয়তো করা হবে।’



সাতদিনের সেরা