kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

১৩৩ বছর পর ফিরল প্রজাপতি বাদুড়

শুভ আনোয়ার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়   

২ জুলাই, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৩৩ বছর পর ফিরল প্রজাপতি বাদুড়

ছবি : মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান

বাদুড়ের সঙ্গে কমবেশি সবাই পরিচিত, কিন্তু ‘প্রজাপতি বাদুড়’ কিংবা ‘পেইন্টেড ব্যাট’-এর সঙ্গে অনেকের পরিচয় নেই। ছোট এই প্রাণী দেখে প্রথমে আপনার মনে হবে, এটি বুঝি একটি প্রজাপতি। বাস্তবে কিন্তু তা নয়। আসলে এটি বিরল প্রজাতির বাদুড়। বৈজ্ঞানিক নাম কেরিভোলা পিকটা (কবত্রাড়ঁষধ ঢ়রপঃধ)। মূলত এটি ভেস্পার ব্যাটের একটি প্রজাতি। প্রায় ১৩৩ বছর পর সম্প্রতি বাংলাদেশে এই প্রাণীর দেখা মিলেছে।

দেখতে অসামান্য এই নিশাচর প্রাণী রাতে খাবারের সন্ধানে বের হয়। দিনের বেলা কলাপাতা বা শুকনো বড় কোনো পাতার ভাঁজে লুকিয়ে থাকে। পেইন্টেড ব্যাটের লোম উজ্জ্বল কমলা রঙের। আর ডানায় কমলা ও কালো রঙের মিশ্রণ। রঙের এই ছদ্মবেশে একই রঙের ফুলের মধ্যে অনায়াসে মিশে লুকিয়ে থাকতে পারে এই বাদুড়। বাংলাদেশে মোট ৩২ প্রজাতির বাদুড়ের দেখা মিললেও তিন থেকে চার সেন্টিমিটার আয়তনের ছোট এই বাদুড় একেবারেই দেখা যায় না। এটি গাছের কোটরে, পাতার নিচে, ঝুপড়ি কিংবা ভবনের অভ্যন্তরে অবস্থান নেয়। প্রাপ্তবয়স্ক একটি প্রজাপতি বাদুড়ের দৈর্ঘ্য চার সেন্টিমিটার থেকে ৪.৩ সেন্টিমিটারের মধ্যে হয়ে থাকে। ওজন ছয় গ্রাম থেকে আট গ্রাম। প্রজনন মৌসুম জুন থেকে আগস্ট মাস। প্রজাপতি বাদুড় বছরে একটি বাচ্চা দেয়। মনোহর এই বাদুড়ের দেখা মেলে এশিয়ার ভারত, দক্ষিণ চীন, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডে।

বাংলাদেশে প্রজাপতি বাদুড়ের সর্বশেষ দেখা মিলেছিল ১৮৮৮ সালে। যুক্তরাজ্যের প্রাণিবিজ্ঞানী ডাব্লিউ টি ব্লেনফোর্ডের লেখা ‘ফনা ইন ব্রিটিশ ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে প্রজাপতি বাদুড়ের প্রজাতিটি ঢাকায় দেখা গিয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর কেটে গেছে ১৩৩ বছর। পরে আর বাংলাদেশে প্রজাপতি বাদুড়ের দেখা মেলেনি। বাংলাদেশ থেকে এই প্রজাতির বাদুড় বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে অনেকটা নিশ্চিত হয়েছিলেন প্রাণিবিজ্ঞানীরা। ২০১৫ সালে প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন ও বন বিভাগ থেকে ‘রেড লিস্ট’ নামে দেশে বিপন্ন প্রাণীর একটি তালিকা প্রকাশ করা হয়। সেখানেও এই বাদুড় সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। এ ছাড়া বিশ্বের বন্য প্রাণিবিষয়ক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনে এটি আর বাংলাদেশে টিকে নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে গত ৭ জুন বিরল প্রজাতির প্রজাপতি বাদুড়ের সন্ধান মিলেছে টাঙ্গাইলের মধুপুর জাতীয় উদ্যানের একটি কলাগাছের পাতায়। এটির সন্ধান পেয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান।

ওই দিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মনিরুল হাসান খান ও তাঁর গবেষণা সহকারী স্থানীয় গারো সম্প্রদায়ের লজেশ মৃ বাদুড়টির সন্ধান পান। ওই বাদুড়টির দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন সেন্টিমিটার, ওজন সাড়ে চার গ্রাম। বাদুড়টির ছবিও তুলেছেন অধ্যাপক মনিরুল।

তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, এই বাদুড়গুলো আকারে খুব ছোট। এরা খুব অলস প্রকৃতির। দিনের বেলায় উড়তে চায় না। অন্য বাদুড় দিনের বেলায় বিরক্তির শিকার হলে উড়ে চলে যায়, কিন্তু এরা সে রকম নয়। খুব কালারফুল হওয়ায় একে অনেকটা প্রজাপতির মতো দেখতে। এ কারণে এর প্রচলিত নাম পেইন্টেড ব্যাট হলেও অনেকে একে প্রজাপতি বাদুড় বলে। বাংলায় এর প্রচলিত কোনো নাম নেই।

অধ্যাপক মনিরুল আরো বলেন, ‘যেহেতু অনেক বছর পর প্রাণীটি আবার পাওয়া গেছে, তাহলে ধরেই নেওয়া যায় যে বাদুড়টি এখনো আমাদের দেশে টিকে আছে। এটা অনেক বড় সংবাদ। মধুপুর বনে যেহেতু প্রাণীটির সন্ধান মিলেছে, তাই এখন আরো সন্ধান করব আমরা। ছোট পোকা-মাকড় খেয়ে এরা প্রকৃতিতে অনেক অবদান রাখে।’

প্রজাতিটি বিলুপ্তির বিষয়ে অধ্যাপক মনিরুল বলেন, বিভিন্ন কারণে বিলুপ্ত হতে পারে। এর মধ্যে আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়া কিংবা খাবার কমে যাওয়া প্রধান কারণ হতে পারে। আর অন্য শিকারি প্রাণী কিংবা মানুষের উৎপাতে এদের প্রজনন বিঘ্নিত হওয়াও বিলুপ্তির কারণ হতে পারে। 



সাতদিনের সেরা