kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

‘অফিস খোলা, তাহলে লকডাউনে লাভ কী’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৫ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



‘অফিস খোলা, তাহলে লকডাউনে লাভ কী’

সকাল ৯টা ৪০ মিনিট। আমিনবাজারে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে সেতু পার হচ্ছিলেন গোলাম আলী। রাজধানী শহরের ২২৭ মতিঝিলে তাঁর অফিস। চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে তিনি কাজ করেন বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে। সাভার স্মৃতিসৌধের পেছনের গ্রামে পাঁচ কাঠা জমি কিনে বাড়ি করেছেন। বাড়ি থেকেই প্রতিদিন বাসে অফিসে আসেন।

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে ক্ষোভ জানিয়ে গোলাম আলী এই প্রতিবেদককে বললেন, ‘অফিস খোলা রেখে এভাবে আমাদের যন্ত্রণা দেওয়ার মানে কী? সরকার লকডাউন দেবে দিক, মানতে রাজি আছি। তবে এভাবে কেন? আপনারা হয়তো জানেন না, কম করে হলেও কুড়ি হাজার লোক প্রতিদিন সাভার থেকে ঢাকায় এসে অফিস করে। এ অবস্থায় তাদের শুধু ভোগান্তিই বাড়ছে।’

রাজধানীর আরমানিটোলার বাদল সরদার কাজ করেন সাভারের একটি পোশাক কারখানার সহকারী ব্যবস্থাপক পদে। প্রতিদিন বাসা থেকে সাভারে গিয়ে অফিস করেন। এখন গাবতলী থেকে হেঁটে আমিনবাজার সেতু পার হয়ে আবার বাসে উঠতে হয়। তিনি বলেন, ‘এভাবে লকডাউন দিয়ে লোক আটকানো যাবে না। আমাদের তো অফিসে যেতে হবে।’

গাবতলীতে কর্মরত পুলিশ সার্জেন্ট রফিকুল ইসলামও জানান, ভোর থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত রাজধানীর প্রবেশমুখে চাপ থাকে বেশি। যারা আসছে-যাচ্ছে তার প্রায় সবই অফিসমুখী মানুষ। কেউ সাভার থেকে ঢাকায় অফিস করেন, আবার কেউ ঢাকা থেকে সাভারে অফিস করেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার আশপাশের সাত জেলায় ছিল লকডাউনের তৃতীয় দিন। ঢাকায় লকডাউন দেওয়া না হলেও সাভার থেকে আসা যানবাহন আমিনবাজার সেতুর ওপারে আটকে দেওয়া হচ্ছে। আবার ঢাকা থেকে সাভারমুখী গাড়ি আটকানো হচ্ছে গাবতলীতে।

এ ছাড়া লকডাউন ঘোষণা করা জেলা ও এলাকাগুলোর কোথাও কোথাও বিধি-নিষেধ কার্যকরের জন্য প্রশাসনের কঠোর তৎপরতা দেখা গেছে। আবার কোথাও শিথিল অবস্থা ছিল।

আমাদের নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

রাজধানীর প্রবেশমুখে অফিসগামীদের ভিড় : আমিনবাজারের মতো আব্দুল্লাহপুরেও একই চিত্র দেখা যায়। গাজীপুর থেকে অনেকে ঢাকায় এসে অফিস করেন। আবার অনেকে ঢাকা থেকে গাজীপুর গিয়ে অফিস করেন। একই অবস্থা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জের ক্ষেত্রেও।

আব্দুল্লাহপুর এলাকায় ট্রাক, পিকআপ ভ্যান ও মোটরসাইকেলে যাত্রী বেড়েছে। রয়েছে মাইক্রোবাসও। তবে এসব যাত্রীর বেশির ভাগ দূরপাল্লার যাত্রী। টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার বাসিন্দা হোসেন মিয়া পরিবার নিয়ে বাড়ির উদ্দশে রওনা দিয়েছেন একটি অটোরিকশা নিয়ে। গাজীপুরের চন্দ্রা পর্যন্ত ভাড়া এক হাজার ২০০ টাকা। হোসেন মিয়া বলেন, চন্দ্রা থেকে আবার অটোরিকশা নিয়ে ভূঞাপুর যাওয়া যাবে।

নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর ও চিটাগাং রোড এলাকায় বহু মানুষকে হেঁটেই গন্তব্যের উদ্দেশে যেতে দেখা গেছে। অটোরিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়িতে যাত্রী পরিবহন করতেও দেখা গেছে। নারায়ণগঞ্জের সীমানায় অটোরিকশা ও হিউম্যান হলার (লেগুনা) চলাচল অনেক বেড়েছে। সায়েদাবাদ থেকে বিআরটিসিসহ বিভিন্ন পরিবহনের ছোট বাস নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড পর্যন্ত চলাচল করছে। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলার যাত্রীরা এসব গাড়িতে উঠে বসছে। এরপর মাইক্রোবাস, অটোরিকশা ও মোটরসাইকেলে কয়েক গুণ বাড়তি ভাড়া দিয়ে কয়েকবার বাহন বদলে গন্তব্যে যাচ্ছে তারা। এতে করে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দেওয়া নারী, শিশু ও বয়স্করা ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

কাঁচপুর সেতু পার হলেই দেখা যায়, কিছু ব্যক্তিগত গাড়ি বিভিন্ন এলাকার যাত্রী তুলছে। কুমিল্লা যাবেন মো. ইমরান। তিনি রাজধানীর বংশালে থাকেন। ইমরান বলেন, ‘আমার যাওয়াটা খুবই দরকার। কয়েক দফা ভেঙে এতটুকু এসেছি। এখন প্রাইভেট কারে দেড় হাজার টাকা ভাড়া চায়।’

কোনো একটা সুবিধাজনক বাহনের জন্য সাইনবোর্ড এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন মাইনুদ্দিন আহম্মেদ। চট্টগ্রামের মিরসরাই যাবেন তিনি। সকাল ১০টায় সাভারের হেমায়েতপুর থেকে রওনা হয়ে তিন দফা গাড়ি বদলে সাইনবোর্ডে এসে আটকা পড়েছেন। মাইনুদ্দিন জানান, মাইক্রোবাসে যাত্রীপিছু দুই হাজার টাকা ভাড়া হাঁকছেন চালকরা।

লকডাউন পরিস্থিতি : মেহেরপুরে ১৪ দিনের লকডাউনের প্রথম দিন গতকাল বেশ কড়াকড়ি লক্ষ করা গেছে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ বিভাগ, স্বাস্থ্য বিভাগ ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে মাঠ পর্যায়ে কাজ করতে দেখা যায়। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও করোনা প্রতিরোধ কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানা গেছে।

ফরিদপুর ও জেলার ভাঙ্গা, বোয়ালমারী পৌরসভায় সাত দিনের চলমান লকডাউনের চতুর্থ দিনে সড়কে সড়কে পুলিশ বেশ তৎপর ছিল। জেলা প্রশাসন বিভিন্ন জায়গায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে।

গোপালগঞ্জে লকডাউনের তৃতীয় দিনে পুলিশের টহলসহ ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম চলেছে। জেলা প্রশাসন মাইকিংসহ নানাভাবে প্রচার চালাচ্ছে।

বাগেরহাটের ৯ উপজেলায় লকডাউনের প্রথম দিন প্রশাসন ছিল কঠোর অবস্থানে। জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা দিনভর মাঠে ছিলেন। জেলার প্রবেশমুখে বসানো হয়েছে পুলিশের চেকপোস্ট। সাপ্তাহিক হাট ও পশুর হাট বন্ধ রাখা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমও ছিল।

নাটোরের আটটি পৌরসভায় লকডাউনের দ্বিতীয় দিনে পুলিশ ও প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়লেও বহু মানুষকে চলাফেরা করতে দেখা যায়।

ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন এলাকায় আজ শুক্রবার সকাল ৬টা থেকে লকডাউন বলবৎ হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জে লকডাউনের তৃতীয় দিনে জীবনযাত্রা অনেকটা স্বাভাবিক ছিল। হাট-বাজারে মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। শিমুলিয়া ফেরি ঘাট দিয়ে পণ্যবাহী গাড়ি ও অ্যাম্বুল্যান্সের সঙ্গে ব্যক্তিগত বহু গাড়ি পারাপার হচ্ছে। প্রতিটি ফেরিতেই থাকছে শত শত মানুষ।

নারায়ণগঞ্জে ১৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে। পাশাপাশি সড়ক-মহাসড়কগুলোতে ৩০ চেকপোস্ট বসিয়ে পুলিশ কঠোরভাবে মানুষের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে শহরে রিকশা, অটোরিকশা ও পণ্যবাহী গাড়ি চলতে দেখা যায়। শীতলক্ষ্যা নদীতে দুই দিন খেয়া নৌকা পারাপার বন্ধ থাকার পর গতকাল আবার খুলে দেওয়া হয়েছে।         

সীমান্তবর্তী সাতক্ষীরায় চতুর্থ দফায় আরো এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। তবে গতকাল আগের মতোই মানুষের মধ্যে লকডাউন না মানার প্রবণতা দেখা গেছে। শহরের দোকানপাট আংশিক খোলা ছিল। হাট-বাজারগুলোতে জনসমাগম কমেনি।

শেরপুরের সদর উপজেলায় চলমান লকডাউনের তৃতীয় দিন ছিল গতকাল, তবে সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যবিধির তেমন তোয়াক্কা করছে না। তারা যত্রতত্র চলাফেরা করছে।

নোয়াখালী পৌরসভা ও ছয়টি ইউনিয়নে চলমান কঠোর লকডাউন আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে জেলা প্রশাসন। একই সঙ্গে জেলার বেগমগঞ্জ উপজেলার দুটি ইউনিয়ন এবং চৌমুহনী পৌরসভাকে লকডাউনের আওতায় আনা হয়েছে।