kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

শিকলবন্দি ২০ বছর ‘কেউ নেই’ দেখার

অমিতাভ অপু, দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা)   

২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



শিকলবন্দি ২০ বছর ‘কেউ নেই’ দেখার

নাম নজরুল ইসলাম। বয়স ৪০ বছর। বাড়ি ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলার নতুন বান্দুরা গ্রামে। ২০ বছর ধরে শিকলবন্দি। ২০ বছর আগেও স্বাভাবিক ছিল তাঁর জীবন। অসচ্ছল ও দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া নজরুল পড়াশোনায় ছিলেন অদম্য মেধাবী। শুধু তাই নয়, ছিলেন কোরআনে হাফেজও। স্পষ্ট ভাষায় তাঁর সুমধুর কণ্ঠের আজান আর কোরআন তেলাওয়াতে মুগ্ধ হতো এলাকার মানুষ।

এলাকাবাসী জানায়, স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় নজরুল ভালোবেসেছিলেন প্রতিবেশী এক মেয়েকে। তবে দুই পরিবারের মতের অমিল থাকায় সেই সম্পর্ক গড়ায়নি বিয়ে পর্যন্ত। কিছুদিন পরই অন্যত্র বিয়ে হয়ে যায় মেয়েটির। ওই বিয়ের পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন নজরুল। আসক্ত হয়ে পড়েন নেশায়। এক পর্যায়ে ২০০১ সালের দিকে তিনি পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। অসচ্ছল পরিবার চিকিৎসা করাতে না পারায় শিকলবন্দি এখন তাঁর জীবন।

সরেজমিন দেখা যায়, ভাঙাচোরা টিনের চালার একটি ঘরের বারান্দায় শিকল পায়ে মাটিতে বসে আছেন নজরুল। শরীরে শুধু প্যান্ট ছাড়া আর কোনো কাপড় নেই। ঘরের ভেতরেই গোসল ও টয়লেটের ব্যবস্থা। তবে ঘরটি কাঁচা হওয়ায় গোসলের পর পুরো ঘর কাদা হয়ে যায়। এ ছাড়া ঘরটি ভাঙা হওয়ায় শীতকালে ঠাণ্ডায় কষ্ট পেতে হয় তাঁকে।

দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে নজরুল দ্বিতীয়। বাবা আয়নাল দেওয়ান ও মা নবীজা বেগম ছেলের চিকিৎসার জন্য চেষ্টা চালিয়ে গেছেন জীবনের শেষ অধ্যায় পর্যন্ত। তবে সুফল মেলেনি কোনো। তাঁরা মারা যাওয়ার পর মানসিক ভারসাম্যহীন নজরুলের দায়িত্ব পড়ে দুই বোনের ওপর। ইচ্ছা থাকার পরও আর্থিক সংকটে তাঁর উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছে না পরিবারটি।

নজরুলের বড় বোন কোহিনুর বেগম বলেন, ‘অর্থের অভাবে পুরোপুরিভাবে চিকিৎসা করাতে না পেরে ভাইকে শিকলে বেঁধে রাখতে হচ্ছে। আমার মেয়ে আঁখি এখন তার মামার দেখাশোনা করে। সরকারিভাবে আমাদের কোনো ভাতাও দেওয়া হচ্ছে না।’ তিনি সরকারি সহায়তা চান ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য।

নজরুলের দুলাভাই মো. আবজাল বলেন, আর্থিক সংগতি না থাকায় নজরুলের চিকিৎসার জন্য তাঁদের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে।

ছোট বোন শাহিনুর বেগম বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। বাবাও মইরা গেছে অনেক আগে। মা পাগল ভাইটারে নিয়া অনেক কষ্ট করেছে। মাইনসের বাড়ি বাড়ি কাজ কইরা ভাইয়ের চিকিৎসা করাইছে। দুই মাস আগে মা-ও মইরা গেল। ভাইরে কে দেখবে, ওর যে কী হইব আল্লায় জানে।’

নজরুলের খালা খোদেজা বেগম বলেন, ‘মানসিক ভারসাম্যহীন থাকায় নজরুল প্রতিনিয়ত বিভিন্নজনকে মারধর ও বিরক্ত করত, নেশা করে বেড়াত। টাকার অভাবে তার পুরোপুরি চিকিৎসা করানোও সম্ভব হয়ে ওঠেনি। ওর যন্ত্রণার মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় ২০ বছর আগে পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে ঘরে বেঁধে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। তবে মাঝে একবার কিছুটা সুস্থ হয়ে কাজও করেছে। কিছুদিন পর আবারও পাগল হয়ে যাওয়ায় শিকলবন্দি করা হয়েছে। এমনকি নিজের পরিবারের লোকজন কাছে গেলেও সে আঘাত করার চেষ্টা করে। এ জন্যই পায়ে শিকল বেঁধে রাখা হয়েছে।’

২০ বছরেও নজরুলের কাছে পৌঁছেনি প্রতিবন্ধী ভাতা বা সরকারি কোনো সুযোগ-সুবিধা। ভাঙাচোরা একটি ঘরে অমানবিক জীবন ধারণ করা আর খেয়ে না খেয়ে দিন পার করা পরিবারটি এখন কী করবে—সেই ভেবে দিশাহারা পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরাও।

জানতে চাইলে নবাবগঞ্জ উপজেলা সমাজসেবা অফিসার মিজানুর রহমান বলেন, বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তিনি বলেন, পুরোপুরি পাগল হলে নজরুল ইসলামকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেওয়ার সুযোগ নেই।

তবে পরিবারের আশা, সুচিকিৎসা পেলে হয়তো নজরুল স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতে পারে। এ জন্য তারা সরকার ও সমাজের দায়িত্বশীলদের এগিয়ে আসার আহবান জানিয়েছে।



সাতদিনের সেরা