kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

১৯ বছর পর ঠিকানা পেলেন সোলায়মান

সোহেল হাফিজ, বরগুনা   

২৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১৯ বছর পর ঠিকানা পেলেন সোলায়মান

মায়ের সঙ্গে সোলায়মান

সরকারি শিশু পরিবারে বেড়ে ওঠা শিশুরা অনাথ হলেও তাদের বাড়ি থাকে। থাকে নানাবাড়ি। মা-বাবা না থাকলেও থাকে স্বজন। কিন্তু অসহায় শিশু সোলায়মানের চারকুলে কেউ ছিল না। মা-বাবা তো দূরের কথা, সোলায়মানের বাড়ি কোথায় তা-ও জানা ছিল না কারো।

ছোট্ট সোলায়মান যখন সবে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী, তখন থেকেই তাঁর ঠাঁই হয় বরগুনার সরকারি শিশু পরিবারে। সেখান থেকেই মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাস একাকী সোলায়মানের। সরকারি বিধি অনুযায়ী ১৮ বছর বয়সের পর সরকারি শিশুপল্লীতে থাকার সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়ে সংবাদপত্র বিক্রেতার চাকরি নিয়ে শহরের একটি বস্তিতে ঠাঁই হয় তাঁর।

সংবাদপত্র বিক্রেতা হিসেবে বরগুনা শহরের পরিচিত মুখ সোলায়মান (২৬)। তবে তাঁর জীবনের করুণ গল্পটা ছিল সবার অজানা। কোথায় তাঁর বাড়ি, কোথায় তাঁর মা-বাবা, কোথায় তাঁর ঠিকানা কিছুই জানতেন না সোলায়মান। আজ থেকে ১৯ বছর আগে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে সাত বছরের ছোট্ট শিশু সোলায়মানকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে বরগুনা যাত্রা করেন অসহায় মা আমেনা। চাঁদপুর লঞ্চঘাট এসে মায়ের কাছ থেকে হারিয়ে যান সোলায়মান। সেই থেকে শুরু মা-ছেলের বিচ্ছিন্ন জীবনের করুণ কাহিনি। একমাত্র ছেলে ছোট্ট সোলায়মানকে হারিয়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন স্বামী পরিত্যক্তা আমেনা বেগম।

বরগুনা গ্রেস ক্লাবের সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা সোলায়মানের জীবনের এই ঘটনা জানতে পেরে গত ১৮ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন। এরপর থেকে সোলায়মানের মা-বাবাকে খুঁজে পেতে একযোগে কাজ করেন বরগুনা প্রেস ক্লাবের সদস্যরা। এগিয়ে আসেন স্থানীয়রাও।

ফেসবুকে সোলায়মানের ঘটনা জেনে পটুয়াখালী জেলার মির্জাগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ আমড়াগাছিয়া গ্রাম থেকে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সোলায়মানেরই এক খালাতো ভাই মামুন (২৫)।

এর পরের গল্পটা আরো বেশি আবেগঘন। সোলায়মানকে নিয়ে বরগুনা প্রেস ক্লাবের সদস্যরা মোটরসাইকেলে রওনা হয়ে যান তাঁর মাকে খুঁজতে প্রত্যন্ত আমড়াগাছিয়া গ্রামে। সোলায়মানের মা আমেনা বেগমের মামাতো বোনের বাড়ি এটি। এখানেই দীর্ঘ ১৯ বছর পর দুঃখিনী মা আমেনাকে খুঁজে পান সোলায়মান। গ্রামজুড়ে ততক্ষণে বিরাজ করতে থাকে আনন্দাশ্রু পরিবেশ। মা-ছেলের সঙ্গে সেই আনন্দে একাকার হয়ে পড়ে পুরো এলাকাবাসী। সোলায়মান বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে শুধু আমার মা আমেনা, বাবা বেলাল আর মামা আল-আমিনের নাম মনে রাখতে পেরেছিলাম। আর কিছুই মনে ছিল না। তাই মনে মনে অনেক খুঁজলেও ঠিকানা না জানার কারণে গত ১৯ বছরেও মা-বাবার সন্ধান পাইনি।’

অসহায়ত্বের কথা বলতে গিয়ে সোলায়মান বলেন, ‘বছরের দুই ঈদে সহপাঠী বন্ধুদের দাদা-দাদি, নানা-নানি কিংবা অন্য স্বজনরা এসে খোঁজ নিতেন। বাড়ি নিয়ে যেতেন। কিন্তু আমার খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ ছিল না। কে-ই বা খোঁজ নেবে? আমার তো কোনো বাড়িই ছিল না। ছিল না কোনো ঠিকানাও।’

বরগুনা প্রেস ক্লাবের সদস্য জাহাঙ্গীর কবীর মৃধা বলেন, ‘সেদিন কথা প্রসঙ্গে সোলায়মানের বাড়ি কোথায় জানতে চাইলে সে জানায় তার কোনো বাড়ি নেই। প্রথমে বুঝতে পারছিলাম না। কেন ওর বাড়ি নেই। পরে ওর কাছ থেকে ওর জীবনের বেদনাবিধুর কাহিনি যতই শুনছিলাম ততই কাতর হয়ে পড়ছিলাম। সোলায়মান চলে যাওয়ার পর আমি আমার চোখের জল আর ধরে রাখতে পারিনি। অশ্রুসিক্ত হয়েই আমি ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস লিখি। আমার লেখাটি অসংখ্য শেয়ার হয়েছে। এর কদিন পরই আমাকে ফোন করে সোলায়মানেরই এক খালাতো ভাই মামুন।’

সোলায়মানের মা আমেনা বেগম জানান, তাঁর বাবার বাড়ি বেতাগী উপজেলার লক্ষ্মীপুরা গ্রামে। অভাবের কারণে কাজের খোঁজে একসময় চট্টগ্রাম শহরে চলে যান তিনি। সেখানে ভোলা জেলার বাসিন্দা দরিদ্র শ্রমিক বেলাল হোসেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং বিয়ে হয়। সেই ঘরেই সোলায়মানের জন্ম। বিয়ের পর থেকেই স্বামী বেলাল হোসেন তাঁকে অনেক নির্যাতন করতেন। তাই একসময় বাধ্য হয়ে ছোট্ট শিশু সোলায়মানকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়ি বরগুনার বেতাগীতে রওনা হন।

চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে চাঁদপুর এসে সোলায়মানকে নিয়ে তিনি বরগুনার লঞ্চে ওঠেন। এ সময় সোলায়মানকে লঞ্চে বসিয়ে রেখে রুটি কিনতে নিচে নামলে লঞ্চ ছেড়ে দেয়। এরপর অনেক কান্নাকাটি করেও আর সেই লঞ্চ থামানো যায়নি। দুঃখিনী মা আমেনা বেগম বলেন, ‘সোলায়মানের জন্য নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিলাম আমি। তার পরের ঘটনা আর মনে করতে পারিনি।’



সাতদিনের সেরা