kalerkantho

শুক্রবার । ৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৩ জুলাই ২০২১। ১২ জিলহজ ১৪৪২

রিকশার চাকায় চলে কালামদের জীবন!

১১ হাজার ৬৭৫ জন পৌর কর্মচারীর প্রায় ৮৭৫ কোটি টাকা বেতন বকেয়া

জহিরুল ইসলাম   

২৩ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রিকশার চাকায় চলে কালামদের জীবন!

‘কে বুঝবে আমাদের সমস্যা! এমন একটা চাকরি লইছি, রিকশা চালায়া খাইতে হয়। ৫৪ মাস বেতন পাই না। বউ-বাচ্চা-সংসার লইয়া কেমনে চলি! মনমতো কিছুই করতে পারি না। একটা লোক পুরা মাস কাম করে যদি পয়সা না পায়, কেমনে চলবে?’

গত বুধবার কথাগুলো বলছিলেন ভোলার লালমোহন পৌরসভার অফিস সহায়ক আবুল কালাম আজাদ। ২৩ বছর ধরে চাকরি করলেও আয় বাড়েনি; বেড়েছে সংসার আর অভাব। শুধু আবুল কালামই নন, পৌরসভায় কাজ করা এমন হাজারো সদস্য ও তাঁদের পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ আবার অবসরে চা-দোকানে বসছেন।

পৌর কর্মচারীদের অভিযোগ, সরকারের অন্যান্য প্রশাসনিক ইউনিটের কর্মচারীদের সঙ্গে বৈষম্য থাকায় পৌর কর্মচারীদের দুঃখ-দুর্দশা চরম রূপ নিয়েছে।

বিভিন্ন দপ্তর ও পৌরসভায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের ৩২৯টি পৌরসভার মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ পৌরসভায় ২ থেকে ৭০ মাস পর্যন্ত বেতন-ভাতা বকেয়া রয়েছে। অবসরকালীন ভাতা বকেয়া রয়েছে এক হাজার ২৬ জনের। ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে ইউনিয়ন পরিষদের কর্মচারীদের বেতন খাতে বরাদ্দ বাড়লেও এই খাতে পৌর কর্মচারীদের বরাদ্দ বাড়েনি।

নড়াইল কালিয়া পৌরসভার টিকা দানকারী হিসেবে কাজ করেন জয়দেব কুমার দাস। ২২ বছর ধরে পৌরসভায় কাজ করা জয়দেব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘৩০ মাস ধরে বেতন পাই না। খুব কষ্টে চলছি। মা অসুস্থ, স্ত্রীর হার্টে সমস্যা। তাই অফিস শেষ করে চা-দোকান চালাই। গত বছর মাত্র দুই মাসের বেতন পেয়েছি।’

বগুড়ার সোনাতলা পৌরসভার গার্বেজ (আবর্জনা) ট্রাকচালক হাবিবুর রহমান হাবুল বলেন, ‘পাঁচ মাস বেতন পাই না। সংসার অচল, কী বলি আর! বাবার বয়স ১০৭ বছর। দিনে ওষুধ লাগে ২৩০ টাকার। বাধ্য হয়ে বিকেলে পান-সিগারেট বিক্রি করি।’

কর্মীদের কষ্টের কথা স্বীকার করে বগুড়ার সোনাতলা পৌরসভা মেয়র জাহাঙ্গীর আকন্দ বলেন, ‘আমাদের বেতন-ভাতা সম্মানী সম্পূর্ণ মানুষের কাছ থেকে নেওয়া লাগে। সরকারের কাছ থেকে সামান্য টাকা পাই। করোনায় পৌরকর আদায় বন্ধ হয়ে গেছে। ট্রেড লাইসেন্স করাও বন্ধ। কী বলব!’

আয় থাকার পরও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করে না—এমন পৌরসভার মধ্যে ভোলার লালমোহনও আছে। স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলে এই পৌরসভায় কর্মী আছেন ১০২ জন। পৌরসভাটির রাজস্ব আয়ের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৭-১৮ সালে আয় হয়েছে তিন কোটি ৩২ লাখ ২২ হাজার ১৯০ টাকা। চাহিদা ছিল এক কোটি ৩৫ লাখ ৭০ হাজার ৩০৫ টাকা। পরের কয়েক বছরেও আয় বেশি হয়েছে। কিন্তু কর্মীদের ৬ থেকে ৩৮ মাস পর্যন্ত বেতন বাকি রয়েছে।

জানা যায়, বেতন পরিশোধ না করায় পৌর মেয়রকে মন্ত্রণালয় থেকে বারবার বলা হলেও কাজ হয়নি। পৌর মেয়র এমদাদুল ইসলাম তুহিন বলেন, ‘রাজস্ব আয় বেড়েছে গত দুই বছর। এই বছর আবার কমে গেছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার বাজার ইজারা দেওয়া যায়নি। পরিস্থিতি ঠিক হলে আয় মোটামুটি পর্যায়ে পৌঁছবে।’

স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্ম সচিব (নগর উন্নয়ন-২ অধিশাখা) সায়লা ফারজানা বলেন, ‘কিছু পৌরসভা তাদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে। আর কিছু পৌরসভার সামর্থ্য নেই। আবার কোনো পৌরসভা আয় দিয়ে উন্নয়ন কাজ করে। অথচ আইনে স্পষ্টভাবে বলা আছে, রাজস্ব আয় থেকে টাকা দিয়ে প্রথমে বেতন দিতে হবে। তারপর বাড়তি থাকলে উন্নয়ন প্রকল্প। অনেক মেয়র এসব মানতে চান না।’

লালমোহন পৌরসভার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেখানকার পৌর মেয়রকে আলাদা করে চিঠি দেওয়া হয়েছে। বারবার বেতন পরিশোধ করার কথা বলা হয়েছে। তিনি যদি বেতন পরিশোধ না করেন, তাহলে আগামী মাসে তাঁকে শোকজ করা হবে।’



সাতদিনের সেরা