kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

রাজধানীর গণপরিবহন

স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই তবু অতিরিক্ত ভাড়া

লায়েকুজ্জামান ও সজিব ঘোষ   

২২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই তবু অতিরিক্ত ভাড়া

‘ঢাকায় করোনা নেই, করোনা এখন সীমান্ত এলাকায়। খামাখা আমাদের জ্বালাবেন না, অফিসে যেতে দিন।’ মুখে মাস্ক নেই কেন—এ প্রশ্নের জবাবে গত রবিবার সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-১০ নম্বর গোলচত্বর থেকে নিউ মার্কেটগামী বিকল্প পরিবহনের যাত্রী শফিকুল আলম খান ওই কথাগুলো বলেন। তিনি নিউ মার্কেট এলাকায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।

ওই বাসটিতে উঠে দেখা যায় প্রায় অর্ধেকসংখ্যক যাত্রীর মুখেই মাস্ক নেই। মাস্ক নেই বাসের কন্ডাক্টর ও চালকের মুখেও। তবে চালক দেখালেন তাঁর টি-শার্টের পকেটে মাস্ক রয়েছে। যাত্রীও বসানো হয়েছে প্রতিটি আসনে। মিনহাজুল নামের একজন যাত্রী বলেন, ‘আমি এ বাসের নিয়মিত যাত্রী। ধানমণ্ডির ল্যাবএইড হাসপাতালে কাজ করি। বাসের লোকেরা ভাড়াও বেশি নেয়, আবার প্রতি আসনেই যাত্রী নেয়। প্রতিবাদ করে লাভ হয় না, প্রতিবাদ করলে বাস থেকে নামিয়ে দেয়।’

জানতে চাইলে বাসের চালক আলী হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের কোনো দোষ নেই। যাত্রীরা জোর করে বাসে ওঠে এবং পাশাপাশি আসনে বসে এরা খোশগল্প করে। আমরা মাস্কের কথা বললে ধমক দেয়, ওঠার সময় স্যানিটাইজার নিতে বললে বকাঝকা করে।’

রবিবার সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে আজিমপুর, গুলিস্তান, ফার্মগেট, পল্টন, ফুলবাড়িয়া, বাড্ডাসহ রাজধানীর বেশ কিছু প্রধান সড়ক ঘুরে দেখা যায়, একটি বাসেও যাত্রীদের হাতে জীবাণুনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে না। বেশির ভাগ বাসেই দেখা গেছে দাঁড়িয়ে যাত্রী পরিবহন করতে। পাশাপাশি আসনে যাত্রী পরিবহন যেন স্বাভাবিক হয়ে এসেছে।

গুলিস্তান থেকে বাড্ডা সড়কে চলাচলকারী বন্ধু পরিবহনেও দেখা যায় প্রতি আসনেই যাত্রী বহন করা হচ্ছে। বাসে জীবাণুনাশক ব্যবহারের কোনো বালাই নেই, হ্যান্ড স্যানিটাইজারও নেই। হ্যান্ড স্যানিটাইজার কেন দেওয়া হচ্ছে না—জানতে চাইলে বাসের কন্ডাক্টর নুর হোসেন বলেন, ‘কেউ নেয় না বলে আমরাও এগুলো বাসে রাখি না।’ অবশ্য এর বিপরীত কথা বললেন বাসের যাত্রী নওয়াব আলী আকন্দ। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিদিনই এ বাসে যাতায়াত করি, কখনো হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেওয়া দেখিনি। এরা সব আসনে যাত্রীও নিচ্ছে আবার ভাড়াও বেশি নিচ্ছে। দেখার কেউ নেই।’

রাজধানী শহরে বর্তমানে ২৯১টি রুটে বাস চলাচল করছে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক একটি প্রস্তাব দিয়েছিলেন। সে প্রস্তাব অনুসারে রাজধানীর বাস রুট রেশনালাইজেশন কমিটি গঠিত হয়। ১০ সদস্যের ওই কমিটি ঢাকায় বাস রুট কমিয়ে মোট ৪২টি বাস রুট করে রাজধানীর সব বাসকে ২২টি কম্পানির মাধ্যমে পরিচালনা করার সুপারিশ করে। বর্তমানে রাজধানীতে চলাচল করছে ১২০টি কম্পানির বাস। তবে ওই নতুন সুপারিশ এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। সড়কে বিশৃঙ্খলা রয়েই গেছে।

শান্তিনগরে বাসযাত্রী সালাউদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, ‘বাসের সব সিটে যাত্রী থাকলেও রাস্তা থেকে মানুষ ডাকতে থাকে। সামনেই খালি হয়ে যাবে, এই কথা বলে যাত্রীদের তুলবেই।’

সিটি কলেজের সামনে থেকে শ্যামলী যান নোমান আহমেদ। তিনি বলেন, ‘এখন করোনা আর স্বাস্থ্যবিধির কথা বলে পকেট কাটার ধান্দা শুরু হয়েছে। এতে তাদের বেশি লাভ হয়। যেখানে শাহবাগ থেকে শ্যামলীর ভাড়া ২০ টাকা, এখন সিটি কলেজ থেকেও শাহবাগের ভাড়া হিসাব করে ৩০ টাকা নিচ্ছে। তা-ও দুই সিটে দুজন বসে এসেছি। সব কিছু যখন স্বাভাবিক চলছে, এখন বাসভাড়াটাও আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেওয়া উচিত।’

সরেজমিনে দেখা যায়, বাস রুটগুলোর মাঝপথের যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে। বাস ছাড়ার মূল স্ট্যান্ড থেকেই বাসগুলো পুরোপুরি ভরে যাচ্ছে। এর পরের বেশির ভাগ স্ট্যান্ড থেকে যাত্রীদের বাসের বন্ধ দরজা দেখতে হচ্ছে। বেশি ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নারী যাত্রীদের। রাজধানীর সদরঘাট থেকে গাজীপুর, টঙ্গী, মিরপুর ও উত্তরার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাসগুলো ফুলবাড়িয়ায় এসেই যাত্রী বোঝাই হয়ে যায়। পল্টন, কাকরাইল বা শান্তিনগর থেকে যাত্রীরা আর বাসে উঠতে পারছে না। প্রায় একই ছবি ঢাকার অন্য পথেও। আজিমপুর থেকে যেসব বাস উত্তরা, আব্দুল্লাহপুর ও ধামরাই যাচ্ছে, সেসব বাসের বেশির ভাগ আসনই কলাবাগানের আগে যাত্রীতে ভরে যায়। পরের স্ট্যান্ডগুলোতে বাসে ওঠার জন্য যাত্রীদের বাসের পর বাস অপেক্ষা করতে হয়। নিরুপায় হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে বাড়তি ভাড়ায় গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে।

সদরঘাট থেকে বিশ্বরোডগামী ভিক্টর পরিবহনের হেল্পার রুহুল মিয়া বলেন, ‘যাত্রী যা পাই, সঙ্গে সঙ্গে তুলে নিই। কয়েকজন দাঁড়িয়ে গেলে পরের স্টেশনে যাত্রী নামলে দাঁড়ানো যাত্রীরা বসতে পারে।’ 

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েতউল্লাহ বলেন, ‘গণপরিবহন যাতে সরকারের বেঁধে দেওয়া স্বাস্থ্যবিধি ও ভাড়ার নির্দেশ মেনে চলে সে কারণে আমরা আটটি টিম করে দিয়েছি। এর মধ্যে কয়েকটি বাসকে জরিমানাও করা হয়েছে। আমাদের টিম সড়কে ভ্রাম্যমাণভাবে কাজ করছে। তবে সমস্যা হলো অফিস চলাকালীন আমাদের ভ্রাম্যমাণ টিম কাজ করতে পারে না। কারণ যাত্রীদের তাড়া থাকে। কোনো কোনো বাস এই অফিস টাইমের সুযোগ নিতে পারে। তবে আমরা এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছি।’



সাতদিনের সেরা