kalerkantho

রবিবার । ১০ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৫ জুলাই ২০২১। ১৪ জিলহজ ১৪৪২

সাক্ষাৎকার

শরণার্থী সুরক্ষায় ভালো উদাহরণ বাংলাদেশ

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি, পরিচালক (দ. এশিয়া), এইচআরডাব্লিউ

২০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



শরণার্থী সুরক্ষায় ভালো উদাহরণ বাংলাদেশ

শরণার্থী বা শরণার্থীর মতো পরিস্থিতিতে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষায় বিশ্বে ভালো উদাহরণ সৃষ্টি করেছে বাংলাদেশ। ইউরোপীয়দের কাছে বাংলাদেশের দৃষ্টান্ত তুলে ধরছেন মানবাধিকার কর্মীরা—এমনটিই জানিয়েছেন নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের (এইচআরডাব্লিউ) দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি। আজ রবিবার বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রাক্কালে তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন বিশেষ প্রতিনিধি মেহেদী হাসান

কালের কণ্ঠ : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশেষ করে রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তর নিয়ে সাম্প্রতিক সময় এইচআরডাব্লিউ বাংলাদেশের সমালোচনা করছে। এর কারণ কী?

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি : ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের নেওয়ার ব্যাপারে আমরা কিন্তু বিরোধিতা করিনি। আমরা বলেছিলাম, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন, বিশেষজ্ঞদের আনুন। কারণ দ্বীপের মধ্যে মানুষকে কিভাবে রাখা, কিভাবে তাদের ত্রাণ সহায়তা ও সেবা দেওয়া হবে—এটি না বিপজ্জনক ব্যাপার হয়ে যায়। আপনারা (বাংলাদেশ) এতজনকে এনেছেন, ওদের সুরক্ষা দিয়েছেন। চার বছর হয়ে গেছে। এখন যদি কোনো ক্ষতি হয় তাহলে বাংলাদেশের ভালো কাজগুলো আড়ালে পড়ে যাবে।

কালের কণ্ঠ : বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গত সপ্তাহেও বলেছেন যে কিছু এনজিও রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে স্থানান্তরের বিরোধিতা করছে।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি : আমরা বেশ কিছু বিষয়ে সতর্ক করেছিলাম। স্বাস্থ্যসেবা, জীবিকা, শিক্ষা—এগুলোর কী হবে? কদিন আগে যখন জাতিসংঘের প্রতিনিধিদল ভাসানচর পরিদর্শনে গেল তখন রোহিঙ্গারা তাদের সামনে বিক্ষোভ করল। এটি কি বাংলাদেশের জন্য ভালো হলো? আমরা রিপোর্ট দেখতে পাচ্ছি, ভাসানচরে ডায়রিয়ায় তিনটি শিশু মারা গেছে। আমরা সরকারকে বলেছি, আপনারা সিস্টেম ঠিক করেন। তখন সরকার বলেছে, যখন লাখ লাখ মানুষ এসেছিল তখন তো কোনো সিস্টেম ছিল না। কিন্তু আমরা বললাম, হ্যাঁ, সেই ধরনের ব্যবস্থা তো পরে করা হয়েছিল কক্সবাজারে।

কালের কণ্ঠ : সমালোচনা আছে, আপনারা বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলো বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে যতটা সরব ততটা মিয়ানমারের ব্যাপারে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রীও এ কথা বলেছেন।

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি : আমরাও বলছি, কক্সবাজারে লোক বেড়ে যাচ্ছে। আশ্রয়দাতা সম্প্রদায়ের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারের তরফ থেকে প্রাথমিক সমাধান বের হওয়া উচিত। মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন হোক। আর সেটা হতে হলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনেক কিছু করতে হবে। মিয়ানমার তার লোকজনকে এভাবে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে পার পেতে পারে না। এটি আমরাও মানছি। কিন্তু আমরা এটিও বলছি, যখন এখানে আছে তখন দায়িত্ব আপনাদের। আপনাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে বলেছিলেন—রোহিঙ্গাদের জন্য প্রয়োজনে এক বেলা খাব।

এখনো রোহিঙ্গারা কিন্তু একই কথা বলছে। তারা বলছে, আমরা যখন যেতে পারব নিশ্চয়ই চলে যাব। আমাদের তো এটি দেশ না, এটি আমরাও জানি।

কালের কণ্ঠ : আশ্রিত রোহিঙ্গাদের জন্য আপনারা কিভাবে কাজ করছেন?

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি : রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের অনেক যোগাযোগ হয়। দ্য হেগ, আইসিসিতে বিষয়গুলো নিয়ে যাওয়া, জাতিসংঘের স্বাধীন সত্যানুসন্ধানী মিশনকে পরিস্থিতি জানানো—এগুলোর সঙ্গে আমরা যুক্ত। আমাদের কাজের ধরন আলাদা। বাংলাদেশের কথা হলো, হাজার হাজার বাংলাদেশি যেভাবে থাকে সেভাবেই এখানে রোহিঙ্গারা থাকছে। সমস্যা হলো ঝড় বা দুর্যোগের সময় বাংলাদেশিদের অন্যত্র স্থানান্তর করবেন। রোহিঙ্গাদের কোথায় নিবেন? আশ্রিত রোহিঙ্গাদের কোনো ক্ষতি হলে তখন বাংলাদেশের সুনামের ক্ষতি হবে। আমরা সবাই বলি, শরণার্থী সুরক্ষায় বাংলাদেশ ভালো মান সৃষ্টি করেছে। আমরা ইউরোপীয়দের বলি, বাংলাদেশ গরিব দেশ শরণার্থী রাখতে পারছে আর তোমরা রাখতে পার না?

কালের কণ্ঠ : মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি কী?

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি : মিয়ানমারের ভেতরে খুবই খারাপ অবস্থা। বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা এসেছে উত্তর রাখাইন থেকে। মধ্য রাখাইনে এখনো রোহিঙ্গারা অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত শিবিরে বন্দি। ইসরায়েল যেমন ফিলিস্তিনিদের পরগাছা বানিয়েছে, তেমনি মিয়ানমারও তেমন আচরণ করছে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে।

কালের কণ্ঠ : নিকট ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের সম্ভাবনা দেখছেন?

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি : মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী খুবই নেতিবাচক ছিল রোহিঙ্গাদের বিষয়ে। তারাই এখন ক্ষমতায়। যে সু চি সামরিক বাহিনীর পক্ষে দ্য হেগে গিয়েছিলেন, তাঁর দল এখন সুর বদলেছে। তারা বলছে, অতীতে তারা ভুল করেছে। সুযোগ পেলে তারা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করবে। কিন্তু এখন মিয়ানমারে সামরিক বাহিনীর অধীনে রোহিঙ্গাদের পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন কম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার পক্ষে কাজ করছি। চীন এখনো মিয়ানমারকে সমর্থন করে যাচ্ছে। এর সঙ্গে স্বার্থ জড়িত। কিন্তু কত দিন করবে? মিয়ানমারে যদি বেসামরিক সরকার আসে তবে রোহিঙ্গাদের জন্য নাগরিকত্ব আইনও বদলাতে হবে।

কালের কণ্ঠ : মিয়ানমারে সেই পরিবর্তন আসার আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের কী হবে?

মীনাক্ষী গাঙ্গুলি : আমরা দাতাদের বলছি, রোহিঙ্গাদের জন্য সহযোগিতা বাড়াতে। তৃতীয় দেশগুলোতে (মিয়ানমার ও বাংলাদেশের বাইরে অন্য কোনো দেশ) রোহিঙ্গা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। ভারত, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড কেউ রোহিঙ্গাদের নেয় না। নৌকা গেলে ফিরিয়ে দেয়। আঞ্চলিক সমাধান প্রয়োজন।



সাতদিনের সেরা