kalerkantho

সোমবার  । ১২ আশ্বিন ১৪২৮। ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৯ সফর ১৪৪৩

দিনে তিনটির বেশি ছিনতাই মামলা

মোবারক আজাদ   

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



রাজধানীর ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার থেকে অছিম পরিবহনের একটি বাসে ওঠেন বেসরকারি সংস্থার কর্মী আবির (২৮)। বাসে চার-পাঁচজন যাত্রী ছিল। আর কোনো যাত্রী না নিয়েই বাসটি ছেড়ে দেয়। খিলগাঁওয়ের নর্দারপার পৌঁছানোর পর যাত্রীবেশে থাকা লোকগুলো ছুরি দেখিয়ে জিম্মি করে তাঁকে। সঙ্গে থাকা নগদ টাকা ও সোনার চেইন ছিনিয়ে নেয়। এক পর্যায়ে জানালা দিয়ে লাফ দেন আবির। পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। ঘটনাটি গত ৯ জুনের।

একই দিন বিকেলে এরেকা আক্তার নামে এক আইনজীবী হাইকোর্ট থেকে নিজের প্রাইভেট কার চালিয়ে মিরপুরের বাসায় ফিরছিলেন। বাংলামোটর এলাকায় হালকা যানজটে পড়েন। গাড়ির জানালা কিছুটা খোলা ছিল। এক ছিনতাইকারী ছোঁ মেরে তাঁর সোনার চেইনটি ছিঁড়ে নেয়। দৌড়ে সামনের একটি চলন্ত বাসে উঠে পড়ে সেই ছিনতাইকারী। তবে পেছন থেকে জনতার চিৎকার শুনে বাসের লোকজন তাকে আটক করে, ততক্ষণে সে চেইনটি গিলে ফেলে। পরে ছিনতাইকারীকে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

এর আগের দিন ১০ জুন রাজধানীর মতিঝিলের জামিয়া দারুল উলুম মাদরাসার শিক্ষক জসীম উদ্দিন (৫৭) আইএফআইসি ব্যাংকের মতিঝিল শাখা থেকে তিন লাখ টাকা তোলেন। পাওনাদারকে ওই টাকা দিতে এলাকারই ইসলামী ব্যাংকের শাখায় যাচ্ছিলেন তিনি। রাস্তায় এক ব্যক্তি তাঁকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি পড়ে যান এবং অল্প সময়ের মধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন। জ্ঞান ফিরে নিজেকে দেখতে পান ঢামেক হাসপাতালের বিছানায়। সঙ্গে থাকা টাকার ব্যাগটি নেই।

এভাবেই রাজধানীজুড়ে প্রতিনিয়ত ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ পথচারী থেকে প্রাইভেট কারে চলাচলকারী মানুষ। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানের মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের ঘটনা এরই মধ্যে সারা দেশে চাঞ্চল্য তৈরি করেছে। গত ৩০ মে বিজয় সরণি সিগন্যালের যানজটে গাড়িতে বসা মন্ত্রীর হাত থেকে মোবাইল ফোন নিয়ে যায় এক ছিনতাইকারী। এখনো তা উদ্ধার হয়নি।

মে মাসে পর পর দুই দিন দুটি ‘খুনের’ ঘটনায় শিউরে ওঠে মানুষ। ৫ মে রাজধানীর কমলাপুর বিআরটিসি বাস ডিপোর পাশ দিয়ে রিকশায় করে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সুনিতা রানীর ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দেয় ছিনতাইকারী। রিকশা থেকে পড়ে মারা যান তিনি। পরদিন ৬ মে কুড়িল ফ্লাইওভারে সুভাষ চন্দ্র সূত্রধর নামে এক প্রবাসীর লাশ উদ্ধার করা হয়। ছিনতাইকারীরা তাঁকে হত্যা করেছে বলে জানায় পুলিশ। ছিনতাইকারীদের লাগাম টেনে ধরতে পুলিশ হিমশিম খাচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বিভিন্ন থানা সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে রাজধানীর সব থানায় এক হাজার ২১৭টি চুরি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে। মাসে গড়ে ১০১টির বেশি। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) মামলা হয়েছে ৪৩৯টি। গড়ে মাসে ১১০টির মতো, দিনে তিনটির বেশি। অর্থাৎ এ বছর গড়ে মাসে ১০টি চুরি-ছিনতাইয়ের মামলা বেশি হচ্ছে। এ ছাড়া হয়রানি এড়াতে অনেক ভুক্তভোগী থানায় অভিযোগ জানান না। পুলিশের গোয়েন্দা শাখার তথ্য মতে, ডিএমপির বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৩৫৮টি স্পট রয়েছে, যেখানে ছিনতাইকারীরা সক্রিয়।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর পাশাপাশি অপরাধবিজ্ঞানী ও সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, করোনার কারণে অনেক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ায় চুরি, ছিনতাইসহ বাড়ছে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সামনে আরো ভয়ংকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। তাই সবাইকে সচেতন হতে হবে। কোনো ঘটনা ঘটলে তৎক্ষণাৎ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর দ্বারস্থ হতে হবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম বলেন, ‘সব সময় বিচ্ছিন্নভাবে কিছু ছিনতাইয়ের ঘটনা যে ঘটছে না এটা বলা যাবে না। তবে করোনার কারণে মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়াও ছিনতাইয়ের একটা কারণ। তবে ছিনতাই নিয়ন্ত্রণে পুলিশের টহল বাড়ানো হয়েছে।’

জানতে চাইলে সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. অনুপম সেন গত বৃহস্পতিবার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার কারণে বিভিন্ন খাত এত দিন বন্ধ ছিল। এখনো অনেকগুলো বন্ধ। ফলে অনেক মানুষ বেকার হয়েছে পড়েছে। আর এমন পরিস্থিতিতে যখন নিম্ন-মধ্যবিত্ত অনেকে কোনো আয়ের পথ খুঁজে না পায় তখনই অন্যায়ের পথে পা বাড়াচ্ছে।’ এই সমাজবিজ্ঞানী আরো বলেন, ‘চুরি-ছিনতাই করতে মাদকসেবী ও টোকাইধাঁচের একশ্রেণির লোকজন সারা বছরই ওত পেতে থাকে।  আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরো কঠোর হওয়া উচিত।’