kalerkantho

বুধবার । ২০ শ্রাবণ ১৪২৮। ৪ আগস্ট ২০২১। ২৪ জিলহজ ১৪৪২

অস্তিত্বের লড়াইয়ে গৃহকর্মীরা

ফাতিমা তুজ জোহরা   

১৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



স্বামী-সন্তান নিয়ে নবীনগরে বাস করেন ইছামতি বেগম (৩২)। দিনমজুর স্বামীর আয় আর বাসাবাড়িতে কাজ করে যেটুকু রোজগার করতেন, তা দিয়ে চলত দুই সন্তানসহ চারজনের সংসার। করোনার প্রথম ঢেউয়ে যে কাজ হারিয়েছিলেন, পরে সেটা আবার ফেরত পান। কিন্তু কিছুদিন না যেতেই ফের কাজ হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি। কালের কণ্ঠকে ইছামতি বলেন, ‘গেল তিন দিন জোগালির কাজ করছিলাম। ওইটাও বন্ধ হইয়া গেছে। স্বামীরও কাজ নাই। ধার-দেনা কইরা চলতাছি। কী করুম? কার কাছে যামু? নিজেরা না খাইয়া থাকলেও ঘরে পোলাপান আছে। তাদের মুখে তো দুই মুঠো খাওন দেওন লাগে!’ তিন বাড়িতে রান্নার কাজ করতেন ইছামতি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে সেই কাজ হারিয়েছেন। এখন আশায় আছেন পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে ফের জুটবে কাজ।

করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে দুর্বিষহ দিন পার করছে গৃহকর্মীরা। রীতিমতো অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে অবতীর্ণ তারা। করোনা সংক্রমণ বাড়া-কমার সঙ্গে ব্যারোমিটারের মতো ওঠানামা করছে কাজ হারানো ও ফিরে পাওয়া। হতদরিদ্র এই মানুষগুলোর বেঁচে থাকাটাই দায় হয়ে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এবং কাজ হারানোর পর সামান্য একটু সম্মানী পেলেও এই পেশার মানুষগুলো এতটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ত না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ ২০১৬-১৭-এর তথ্য মতে, দেশে গৃহস্থালির কাজে জড়িত কর্মীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লাখ, যাদের ৯৫ শতাংশেরও বেশি নারী। এসব গৃহকর্মীর ওপর নির্ভরশীল ৮০ লাখ পরিবার, যা মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আমাদের দেশের ৮৫ শতাংশ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মধ্যে প্রায় ৫ শতাংশ গৃহকর্মী। তারা ন্যূনতম অধিকার থেকেও বঞ্চিত। গৃহকর্মীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, অসংখ্য গৃহকর্মী নিপীড়নের শিকার। বেতনবৈষম্য, মারধর, কর্মঘণ্টার অতিরিক্ত কাজ, মানসিক, শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার তারা। এই শ্রেণির মানুষগুলো অসহায় বলে বেশির ভাগ ঘটনাই ধামাচাপা পড়ে যায়।

করোনা পরিস্থিতিতে রাজধানীর মোহাম্মদপুর, খিলগাঁও, বাড্ডা ও মিরপুরে ৮৩ জন গৃহকর্মীর ওপর স্বল্পমেয়াদি জরিপ পরিচালনা করেছে ‘সুনীতি’ প্রকল্প। করোনাকালে কাজে যাওয়া অব্যাহত রেখেছিল ৫ শতাংশ গৃহকর্মী। কাজ হারিয়ে আগের কাজে ফিরে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল শতকরা ৫০ জনের। গৃহে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল শতকরা ৫৫ জন।

ঝুঁকিতে শিশু গৃহকর্মীরা : দুই বছর ধরে ১০ বছরের গৃহকর্মী শিশু বন্যার (ছদ্মনাম) ওপর গরম খুন্তির ছেঁকা, মারধর অব্যাহত রেখেছিলেন এক গৃহকর্ত্রী। নির্যাতন সইতে না পেরে পালিয়ে অন্য বাসায় আশ্রয় নেয় সে। গত ১৯ জানুয়ারি বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ বার্ন ইউনিটে তাকে ভর্তি করা হয়। নির্যাতনের শিকার ওই শিশুর বাড়ি পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার হাজিরা গ্রামে। এ ঘটনায় গৃহকর্ত্রীর স্বামীকে আটক করে যাত্রাবাড়ী থানার পুলিশ।  

নিপীড়নের শিকার ৩২টি ঘটনার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজ (বিলস), যেখানে গৃহকর্মীদের অস্বাভাবিক শারীরিক, মানসিক, যৌন নির্যাতনসহ হত্যার ঘটনারও উল্লেখ রয়েছে।

করোনাকালেও থেমে নেই নিপীড়ন : করোনাকালেও থেমে নেই গৃহকর্মী নির্যাতন ও হত্যার ঘটনা। গত ১৪ মার্চ রাজধানীর পল্টনে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুগ্ম পরিচালকের বাসা থেকে লিপি বেগম (৩৩) নামে এক গৃহকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মৃত লিপি ছয় মাস ধরে ওই বাসায় গৃহকর্মীর কাজ করতেন। গত ৪ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের ছাতকে এক গৃহকর্মীকে (১৮) ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এক বছর ধরে মুক্তিরগাঁও নজরুল হকের (সাবেক চেয়াম্যান) বাসায় কাজ করছিলেন তিনি। নজরুল হকের ভাতিজা তাঁকে ধর্ষণ করে। বিষয়টি জানাজানি হলে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে সে। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, কাজের নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও মজুরি, গৃহকর্মীদের অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে আইএলও কনভেনশন-১৮৯ অনুসমর্থন, শিশু শ্রম থেকে মুক্ত, সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত গৃহ শ্রমিকদের জন্য বাজেট বরাদ্দ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তসহ ১২টি সুপারিশ করেছে বেসরকারি সংস্থা অক্সফাম, নারীমৈত্রী, ইউসেফ বাংলাদেশসহ ১০টি সংস্থা।  ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, কাজের নিয়োগপত্র, নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা ও মজুরি, গৃহকর্মীদের অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে আইএলও কনভেনশন-১৮৯ অনুসমর্থন, শিশু শ্রম থেকে মুক্ত, সরকারিভাবে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত গৃহ শ্রমিকদের জন্য বাজেট বরাদ্দ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্তসহ ১২টি সুপারিশ করেছে বেসরকারি সংস্থা অক্সফাম, নারীমৈত্রী, ইউসেফ বাংলাদেশসহ ১০টি সংস্থা।



সাতদিনের সেরা