kalerkantho

সোমবার । ১৮ শ্রাবণ ১৪২৮। ২ আগস্ট ২০২১। ২২ জিলহজ ১৪৪২

ক্লাব মদ জুয়া নিয়ে তপ্ত সংসদ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৮ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৭ মিনিটে



ক্লাব মদ জুয়া নিয়ে তপ্ত সংসদ

রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাব, মদ ও জুয়া নিয়ে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়েছে জাতীয় সংসদে। গতকাল বৃহস্পতিবার আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও তরীকত ফেডারেশনের সদস্যদের অনির্ধারিত আলোচনায় কিছুক্ষণের জন্য সংসদ মুখর ছিল।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশনে দিনের কর্মসূচির শুরুতেই পয়েন্ট অব অর্ডারে ফ্লোর নিয়ে এ বিষয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সদস্য মুজিবুল হক চুন্নু। পরে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলুল করিম সেলিম, বিএনপির হারুনুর রশিদ, তরীকত ফেডারেশনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী এবং বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা বক্তব্য দেন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।

সাবেক প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, ‘কয়েক দিন যাবৎ উত্তরা বোট ক্লাব নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কে করল এই ক্লাব? এই ক্লাবের সদস্য কারা? শুনেছি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকা দিয়ে এই ক্লাবের সদস্য হতে হয়। এত টাকা দিয়ে কারা সদস্য হয়? আমরা তো ভাবতেই পারি না। সারা জীবন এত ইনকামও করি নাই।’ তিনি আরো বলেন, রাজধানীর বিভিন্ন ক্লাবে মদ খাওয়া হয়। জুয়া খেলা হয়। বাংলাদেশে মদ খেতে হলে লাইসেন্স লাগে। সেখানে গ্যালন গ্যালন মদ বিক্রি হয়। লাইসেন্স নিয়ে খেতে হলে এত মদ তো বিক্রি হওয়ার কথা নয়।

অভিজাত এলাকায় ডিজে পার্টি বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, ‘রাজধানীর গুলশান-বারিধারা এলাকায় ডিজে পার্টি হয়। সেখানে ডান্স হয়। মদ খাওয়া হয়। এসব আমাদের আইনে নেই, সংস্কৃতিতে নেই, ধর্মে নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলব, আপনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নির্দেশ দেন, কেন এসব হচ্ছে? কেন বন্ধ করা হবে না? ওই সব ক্লাবের সদস্য কারা হয়? বোট ক্লাবের জায়গার একজন মালিক আছে। তিনি যেতেও পারেন না। এসব দেখতে হবে।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে শেখ ফজলুল করিম সেলিম বাংলাদেশে মদ ও জুয়ার লাইসেন্স দেওয়ার জন্য বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, ‘এ তো বোট ক্লাব, জিয়াউর রহমান স্টিমার ক্লাব করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু মদ-জুয়ার লাইসেন্স বন্ধ করে দিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান আবার চালু করেছিলেন। যারা অপরাধের শুরু করেছে, তাদের আগে বিচার করা উচিত। ওখান থেকে ধরতে হবে।’

বিএনপির মো. হারুনুর রশিদ বলেন, ‘আমাদের বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্য একটি বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। কিন্তু সিনিয়র এক সদস্য (শেখ সেলিম) কোথায় চলে গেলেন? বাংলাদেশে অনেক বিদেশি থাকেন। এ ছাড়া অন্য ধর্মের মানুষদের জন্য, ডোমদের জন্য মদের বৈধতা আছে। কোনো মুসলমানের জন্য আইনে অনুমতি নেই। জিয়াউর রহমান যদি মুসলমানদের মদের লাইসেন্স দিয়ে থাকেন, যদি প্রমাণ করতে পারেন আমি সদস্য পদ ছেড়ে দেব।’ তিনি বলেন, ‘আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলছি। এই সব ক্লাবে মদের ব্যবসার সঙ্গে সরকারি লোক জড়িত। প্রধানমন্ত্রী কোনো দলের নন, উনি রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী। এসব খুঁজে দেখা হোক।’

হারুনুর রশিদের বক্তব্যের সময় হৈচৈ শুরু করেন সরকারি দলের সদস্যরা। এ সময় শেখ সেলিম আবারও ফ্লোর নেন। তিনি বলেন, ‘লাকী খানের নাচের কথা কী ভুলে গেলেন? হিযবুল বাহার। জিয়াউর রহমান এগুলো করেছিলেন। বর্তমান সরকার কোনো মুসলমানকে মদের পারমিশন দেয়নি। বন্ধ করতে গেলেই আপনারাই (বিএনপি) তো চিল্লাচিল্লি করবেন। বলবেন, ফরেনারদের পারমিশন লাগবে।’

আলোচনায় অংশ নিয়ে তরীকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী বলেন, ‘হারুন সাহেবের সদস্য পদ আজই ছেড়ে দেওয়া উচিত। উনি বললেন, জিয়াউর রহমান মুসলমানদের মদ খাওয়ার পারমিশন দেননি। উনি দেখাক, আইনে কোথায় বলা আছে মুসলমানরা মদ খেতে পারবেন না। আইন এখানে এনে দেখাক। পদ ছেড়ে দিক।’

পরে জাতীয় পার্টির সদস্য বিরোধীদলীয় প্রধান হুইপ মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেন, ‘এখানে রাষ্ট্রীয় কিছু বিষয় আছে। বঙ্গবন্ধু লাইসেন্স দেননি। ২১ বছরে আইনকে মিসইউজ করে এটা করা হয়েছে। বিদেশিদের জন্য এটা করেছে। ক্লাবগুলোতে একজন ডাক্তার দিয়ে সার্টিফিকেট নিয়ে নেয়, দৈনিক মদ খেতে হবে। তারপর লাইসেন্স নেওয়া হয়। বিএনপি এই লাইসেন্স দিয়েছিল। এখন কোনো মুসলমান যদি মদ খায় সেখানে সরকারের কিছু করার নেই।’

এ সময় নিখোঁজ রংপুরের ইসলামিক বক্তা আবু ত্ব-হা মোহাম্মদ আদনানকে দ্রুত খুঁজে বের করার দাবি জানান রাঙ্গা।

এদিকে জিয়াউর রহমান দেশে লুটপাট ও হত্যার রাজনীতি শুরু করেছিলেন বলে দাবি করেছেন সরকারি দলের সদস্য ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন। গতকাল জাতীয় সংসদে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এ কথা বলেন। আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদীয় দলের নেতা হারুনুর রশীদ বলেন, দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ভয়াবহ দুর্যোগকবলিত। ঘূর্ণিদুর্গত উপকূলের মতোই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিপর্যস্ত।

আলোচনায় আরো অংশ নেন সরকারি দলের সদস্য জিল্লুল হাকিম, সলিমুদ্দিন তরফদার, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, আ ক ম সারোয়ার জাহান, আবু রেজা মোহাম্মদ নিজামুদ্দিন, শফিউল ইসলাম, শফিকুল আলম খান, মোয়াজ্জেম হোসেন রতন, আনোয়ারুল আজিম আনার, শাহে আলম ও শামসুল আলম দুদু, ওয়ার্কার্স পার্টির বেগম লুত্ফুন্নেসা খান, তরীকত ফেডারেশনের নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, বিকল্পধারার আবদুল মান্নান, জাতীয় পার্টির বেগম রওশন আরা মান্নান ও নাসরিন জাহান রত্না।

হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ বলেন, জিয়াউর রহমান দেশে হ্যাঁ-না ভোট করেছিলেন। আর খালেদা জিয়া এক কোটি ৩০ লাখ ভুয়া ভোটার করেছিলেন। শেখ হাসিনার আন্দোলনের ফলে দেশে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক স্বপন বলেন, বিএনপির সদস্য হারুনুর রশিদ সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা করছেন। অথচ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত সংবিধানের বিরোধিতা করার সুযোগ নেই। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানমুখী প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশ আরো সমৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাবে।

বিএনপির হারুনুর রশিদ বলেন, এবারের বাজেট অত্যন্ত বিদেশনির্ভর। এটি ৫০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ঘাটতির বাজেট। করোনাকালে এই বাজেট বাস্তবায়ন মোটেই সম্ভব নয়। এই মহাজোট সরকারের এটি ১৩তম বাজেট। এর আগে ১২টি বাজেট সংসদে উত্থাপিত হয়। কোনোটিই বাস্তবায়িত হয়নি। ব্যাংকগুলো সাংঘাতিকভাবে আক্রান্ত। কোটি কোটি টাকা ঋণ নিচ্ছে, কিন্তু ফেরত দিচ্ছে না। তিনি আরো বলেন, কিছুদিন আগে একজন আলেম নিখোঁজ হয়েছেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন—খোঁজ নিচ্ছি। তাঁকে ফিরিয়ে দিতে না পারলে তা রাষ্ট্রের জন্য বড় ব্যর্থতা হবে। আদনানকে অবশ্যই ফিরিয়ে দিতে হবে।

আবদুল মান্নান বলেন, বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের ওপর ১৫ শতাংশ করারোপের প্রস্তাবে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্ট মহলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। স্বাস্থ্য খাত মানুষের ন্যূনতম চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। করোনাকালে এই খাতের অনেক অনিয়ম ও অসংগতি জনগণ দেখেছে। চলতি অর্থবছরে এডিপির টাকা খরচে হতাশার চিত্র দেখা গেছে।

যুবসমাজের অবক্ষয়ের কথা তুলে ধরে জাতীয় পার্টির গোলাম কিবরিয়া টিপু দেশে ‘টিকটক’ অ্যাপ বন্ধে আইন প্রণয়নের দাবি করেন।

অধিবেশন ২৮ জুন পর্যন্ত মুলতবি : জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত মুলতবি করা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে গত ২ জুন বাজেট অধিবেশন শুরু হয়। ৩ জুন ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। গত ১৪ জুন থেকে বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা শুরু হয়।

আগামী ২৯ জুন অর্থবিল ও ৩০ জুন মূল বাজেট ও নির্দিষ্টকরণ বিল পাস হবে। পয়লা জুলাই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা রওশন এরশাদের ভাষণের মধ্য দিয়ে করোনাকালের দ্বিতীয় বাজেট অধিবেশন শেষ হবে।



সাতদিনের সেরা