kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ৩ আগস্ট ২০২১। ২৩ জিলহজ ১৪৪২

গার্ড অব অনারে নারী ইউএনওর বিকল্প প্রস্তাব

নারীর ক্ষমতায়ন সমতায় রাশ টানার চেষ্টা

ফাতিমা তুজ জোহরা   

১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



নারীর ক্ষমতায়ন সমতায় রাশ টানার চেষ্টা

নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠা করতে তৎপর সরকার। রাষ্ট্রীয় পর্যায় থেকে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের চেষ্টা হলেও বাস্তব চিত্র হলো—নারীর অগ্রযাত্রা থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে নানা দিক থেকে। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব, সংস্কৃতিবিমুখতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের প্রাধান্য না দেওয়া, ধর্মান্ধতার কারণেই সমাজে নারীবিদ্বেষী মনোভাব বিরাজ করছে—এমনটা মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংবিধানের আলোকে নারী-পুরুষ সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন সুসংহত করার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে নারী উন্নয়ন নীতি প্রণীত হয়। ১৯৯১ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন নারী। বিরোধীদলীয় নেতা এবং স্পিকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। এ ছাড়া সরকারের সচিব, মেজর জেনারেল, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সামরিক-বেসামরিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন পদে দায়িত্ব পালন করছেন নারীরা। মাঠ প্রশাসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), জেলা প্রশাসন, পুলিশের এসপি পদেও আছে তাঁদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি। স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও জাতীয় সংসদের প্রতিনিধিত্ব করছেন নারীরা। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান সপ্তম। সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় বিশ্বে ১৫৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ৫০তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম (গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ)।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পর দেশে নারীর ক্ষমতায়নের এ পর্যায়ে এসে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের মৃত্যুর পর রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদানে নারী ইউএনওর বিকল্প খোঁজার প্রস্তাব দিয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সংসদীয় কমিটি। এ ধরনের প্রস্তাবে নারীর অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে কিছু মানুষের মনোভাব ও বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একদিকে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ধর্মের দোহাই দিয়ে নারীকে সরিয়ে রাখার অপচেষ্টা চলছে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে উন্নয়নের মহাসড়কে দাঁড়িয়ে এ ধরনের লজ্জাজনক বক্তব্য কোনোভাবেই কাম্য নয়। করোনাকালে নারী ঘরে নির্যাতিত, কিন্তু আজ নারীরা রাষ্ট্রীয়ভাবেও নির্যাতিত। অনেক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নারী তার নিজ যোগ্যতায় প্রশাসনে জায়গা করে নিয়েছে। নারীর অর্জনকে নষ্ট করার অধিকার কেউ রাখে না। নারী কর্মকর্তারা সরকারের প্রতিনিধি। সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করেই স্বীয় মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে তৃণমূলের রাজনীতি থেকে শুরু করে দেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দায়িত্বও তাঁরা পালন করছেন কৃতিত্বের সঙ্গে।

স্থানীয় সরকার ও শাসন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক তোফায়েল আহমেদ বলেন, এ যুগে এসে নারী-পুরুষ নিয়ে আলাদাভাবে প্রশ্ন তোলাটাই অস্বাভাবিক। নারী সচিব-ডেপুটি কমিশনার আছেন। এই সময়ে এসে নারী ইউএনও নিয়ে কথা বলাটা অত্যন্ত পশ্চাৎপদ চিন্তা। বিশেষ কোনো অনুকম্পা-আনুকূল্য দিয়ে নারীকে পদায়ন করা হয়নি। নারীর স্বীয় মূল্যায়ন আছে। একজন নারী নিজ যোগ্যতায় ইউএনও পদে আসেন। এ ক্ষেত্রটা নারী ও পুরুষের নয়।

নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশিদ মনে করেন, ধর্মকে যারা রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে তাদের একটা উত্থান আছে। প্রান্তিক পর্যায়ে আমাদের সংস্কৃতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়েও একই ঘটনা ঘটছে। গ্রামের ওয়াজ মাহফিলে খুব কটু ও অশ্লীলভাবে নারীদের নিয়ে কথা বলা হয়। নারীদের নিয়ে কোরআন-হাদিসে নেই—এমন মন্তব্য করছে তারা। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে কিভাবে? শর্ষের মধ্যেই ভূত আছে। সাংস্কৃতিক চর্চাও নেই। সংস্কৃতির জন্য এক পার্সেন্টও বাজেট বরাদ্দ হয়নি। এটা উৎসাহিত করারও কোনো কর্মকাণ্ড নেই।

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে. চৌধূরী মনে করেন, সমাজ কখনো নারীকে বাধা দিয়ে রাখতে পারেনি। এই চেষ্টা করে সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। যারা এ সুপারিশ করেছে তাদের পশ্চাৎপদ মানসিকতা মুক্তিযুদ্ধের সময় সাম্প্রদায়িক দোসরদের কথা মনে করিয়ে দেয়। সাম্প্রদায়িক, নারী ও মানবাধিকারবিরোধী এই গোষ্ঠী নারীকে আরো পেছনে ঠেলে দিতে চাইছে। এই মনোভব দেশের সংবিধানকে ছোট করে। নারী নেতৃত্বকে হেয় করে। এই গোষ্ঠীকে যেন আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া না হয়—এই দাবি থাকবে আমার।



সাতদিনের সেরা