kalerkantho

শনিবার । ১০ আশ্বিন ১৪২৮। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৭ সফর ১৪৪৩

তাসবিহ জপেই মাসে ১৫ হাজার টাকা!

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ (আঞ্চলিক)   

১৭ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



তাসবিহ জপেই মাসে ১৫ হাজার টাকা!

তাসবিহ জপার (গণনা) জন্য ১২৪ জন নারীকে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা করে পারিশ্রমিক দিয়ে যাচ্ছিলেন ঢাকার এক নারী। প্রায় এক বছর ধরে এভাবেই চলছিল। কিন্তু প্রায় আট মাস ধরে মাসান্তের সেই অর্থপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। তাসবিহ গণনাকারী নারীদের দাবি, তাঁদের পাওনার পরিমাণ ৩৩ লাখ টাকা।

ঘটনাটি ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার মধ্য বাঁশহাটি গ্রামের। গত মঙ্গলবার বিকেলে তাসবিহ গণনাকারী নারীরা পাওনা অর্থের দাবিতে ঢাকার ওই নারীর স্থানীয় প্রতিনিধিকে নিজ বাড়িতে আটকে রাখেন। পরে ঘটনাটি সালিস পর্যন্ত গড়ায়। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারীকে উদ্ধার করে।

সরেজমিনে বাঁশহাটি গ্রামে গেলে নান্দাইল-কেন্দুয়া সড়কের পাশে একটি দোকানঘরের ভেতরে লোকজনের জটলা দেখা যায়। কাছে গিয়ে জানতে চাইলে শুক্কুর আলী নামের সাবেক এক ইউপি মেম্বার বলেন, ‘অত দিন কাডাইয়া (পরিশ্রম) অহন লাখ লাখ টেহা বকেয়া রাখছে এই নারী। এর লাইগ্যা তারে আটকাইয়া স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয়নের লাইগ্যা কয়েকজন বইছি।’

পাওনা টাকা নিতে আসা কয়েকজন নারী বলেন, ‘আমরারে কেরে অত দিন কাডাইলো (পরিশ্রম)? রাত জাইগ্যা অত বড় (তাসবিহ দেখিয়ে) তজবি জপছি। মিন্নত অইছে না? টেহা না দিলে হের বাড়ি দহল করবাম।’

আপাদমস্তক বোরকা পরিহিত ওই নারী (ধর্মীয় শিক্ষিকা) জানান, রাজধানীর লালমাটিয়ার বাসিন্দা মোছা. নাসরিন নামের এক নারীর সঙ্গে দুই বছর আগে তাঁর পরিচয় হয়। তিনি দেড় বছর আগে এলাকার কিছু নারীকে একত্র করে ধর্মীয় পথে আনার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন। এ জন্য যা করার তিনি করবেন। সে অনুযায়ী তিনি স্থানীয় ১২৪ জন নারীকে বাছাই করেন। তাঁদের প্রত্যেকের হাতে তুলে দেওয়া হয় এক হাজার দানার একটি তাসবিহর ছড়া। একই সঙ্গে বলে দেওয়া হয়, এক হাজারবার পড়লে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা করে প্রত্যেকের খাতে পয়েন্ট হিসাবে জমা হবে। আর তা পরিশোধ করা হবে মাস শেষে। এভাবেই চলতে থাকে তাসবিহ গণনা। আর প্রত্যেক নারীকে মাস শেষে তাঁদের পারিশ্রমিক হিসাবে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা দিয়ে আসছিলেন তিনি। আট মাস ধরে ঢাকার নারী তাঁকে আর টাকা পাঠাচ্ছেন না। ফলে তিনি ওই ১২৪ জনকে মাসান্তে টাকা দিতে পারছেন না। এর মধ্যে তিনি তাসবিহ জপা বন্ধ রাখতে বলেন। কিন্তু গ্রামের নারীরা তাঁর কথা না মেনে মাস শেষে তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাগাদা দেন টাকা পরিশোধের জন্য। এক মাস ধরে তাঁকে হুমকি-ধমকিও দেওয়া হচ্ছে।

ওই নারী আরো জানান, গত মঙ্গলবার সকাল থেকেই স্থানীয় সালিসকারী আব্দুস ছাত্তার, রুবেল, লুৎফর মেম্বার, শুক্কুর আলীসহ অনেকেই তাঁকে ডেকে আনেন একটি দোকানঘরে। এরপর বকেয়া টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেন। এক পর্যায়ে সালিসের সিদ্ধান্তে টাকা পরিশোধ করবেন মর্মে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করতে বলেন। এ সময় পুলিশ গিয়ে স্ট্যাম্প জব্দ করে তাঁকে উদ্ধার করে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেয়।

নান্দাইল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বারুইগ্রাম মাদরাসার মুফতি মাওলানা হারুন-অর-রশিদ এ বিষয়ে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাসবিহ জপা বা জিকির-আজকার আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এখানে টাকার বিনিময় করা রহস্যজনক।’

নান্দাইল মডেল থানার উপপরিদর্শক সবুর উদ্দিন বলেন, পাওনা টাকা আদায়ের জন্য এক নারীকে এলাকার লোকজন ঘিরে ধরেছিল। স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দেওয়ার জন্য তাঁকে চাপ দেওয়া হচ্ছিল। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই শিক্ষিকাকে উদ্ধার করে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়েছে।



সাতদিনের সেরা