kalerkantho

রবিবার । ১৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৮। ২৮ নভেম্বর ২০২১। ২২ রবিউস সানি ১৪৪৩

তবু পাহাড়কোলে ভীতিকর বাস

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

১৬ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রকৃতিতে পা রেখেছে বর্ষা। আর তাতেই পার্বত্য শহর রাঙামাটিতে নেমে এসেছে ভয়। টানা বর্ষণে ভূমিধসের শঙ্কা থাকায় রাঙামাটিবাসীর মনে ভর করেছে আতঙ্ক। তবু থেমে নেই পাহাড়কোলে ঝুঁকিপূর্ণ বাস। রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, পৌর এলাকায় ৩৩টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থানসহ পুরো জেলায় ভীতিকর পরিবেশে বাস করছে তিন হাজার ৩৭৮টি পরিবারের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ। পাহাড় পাদদেশে বসবাসকারীদের দাবি, নিরুপায় হয়েই এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাস করছে তারা। অন্যদিকে সুধীসমাজের বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু বর্ষা এলেই প্রশাসনের তৎপরতা বাড়ে। অতীতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন না করায় এখনো এমন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে বাস করছে মানুষ। এদিকে প্রাণহানি ও ভূমিধস এড়াতে এবারও ব্যাপক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

রাঙামাটি শহরের ভেদভেদি, যুব উন্নয়ন এলাকা, মনতলা আদাম, সাপছড়ি, পোস্ট অফিস কলোনি, মুসলিমপাড়া, নতুনপাড়া, শিমুলতলী, মোনঘর, সনাতনপাড়া এলাকায় প্রতিবছরই ছোট-বড় পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। প্রশাসনের নানামুখী উদ্যোগের পরও থেমে নেই ঝুঁকিপূর্ণ ওই সব স্থানে বসতি স্থাপন। ঝুঁকি জেনেও বসবাসকারীরা নিজেদের জায়গা থেকে একচুলও নড়তে নারাজ।

২০১৭ সালের ১২ ও ১৩ জুন টানা বর্ষণে ভূমিধসে ১২০ জন এবং ২০১৮ সালের ১১ জুন ১১ জনের মৃত্যু হয়। লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় রাঙামাটি শহরসহ উপজেলাগুলো। প্রাণহানির পাশাপাশি কৃষিজমি ও ঘরবাড়ির ব্যাপক ক্ষতি হয়। বন্ধ হয়ে যায় দেশের সঙ্গে সড়কপথের যোগাযোগ। এ ঘটনার পর পাহাড় কাটা ও পাহাড়ের পাদদেশে ঝুঁকিপূর্ণ বাসের বিষয়টি সামনে এলেও ঘটনার চার বছর পরও দমানো যায়নি এই ভীতিকর বাস। যেসব স্থানে পাহাড়ধসে প্রাণহানি ঘটেছে, সেসব এলাকায় আগের চেয়ে দ্বিগুণ গড়ে উঠেছে বসতি। এতে ফের বেড়েছে প্রাণহানির শঙ্কা।

কেমন আছে রাঙামাটি : ভয়াবহ পাহাড়ধসের চার বছর পরও দৃশ্যত ভালো নেই রাঙামাটি। রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়ক, রাঙামাটি-খাগড়াছড়ি সড়ক, ভেদভেদী, রাঙাপানির মতো সড়কগুলোতে এখনো ক্ষত সারানোর ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে নেওয়া হয়নি। তবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের দাবি, রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ অফিসের অধীন ২০১৭ সালে পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কের বিভিন্ন কিলোমিটারে হাইপ্রতিরক্ষামূলক আরসিসি রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় জেলায় ১৫১টি স্পটে পাঁচ হাজার ৪৭০ মিটার রিটেইনিং ওয়াল নির্মাণকাজ চলমান আছে। এ ছাড়া এই প্রকল্পের আওতায় নালা হবে সাত হাজার ৭৩০ মিটার, কংক্রিটের স্লোপ প্রটেকশন ৭২ হাজার বর্গমিটার কাজ চলমান। যার নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪৯ কোটি টাকা। এতে জেলার ঝুঁকিতে থাকা সব সড়কেই স্থায়ী সংস্কার করা হবে।

রাঙামাটি শহরের তবলছড়ি এবং রাঙামাটি-চট্টগ্রাম সড়কের শিল্পকলা একাডেমি এলাকায় সড়কের ওপর তিন থেকে পাঁচ ফুট জায়গা দখল করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের পানি সরবরাহ লাইন, যা পাহাড়ধসের চার বছরেও সরানোর ব্যবস্থা নেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। ২০১৭ সালে দুর্যাগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিধসের কারণ অনুসন্ধান ও করণীয় সম্পর্কে গঠিত কমিটির প্রতিবেদনে ভূমিধসের কারণ হিসেবে দুর্বল মাটির গঠন, অতিবৃষ্টি, চাষাবাদ, অবৈধ বসতি স্থাপন ও অপরিকল্পিত অবকাঠামো, বৃক্ষ নিধন, উন্নত প্রযুক্তি ও প্রকৌশল ব্যবহার করে পাহাড় শাসন না করা, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, ভূমিকম্পের মতো কারণগুলো চিহ্নিত করে।

মৃত্যুকূপে বাস : শহরের টিভিকেন্দ্র এলাকার মো. আমির হোসেন বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। এরপর বাসাভাড়া দিয়ে থাকার মতো পরিস্থিতি নেই আমাদের। তাই কষ্ট করে অল্প টাকায় শিমুলতলী এলাকায় অল্প জায়গা কিনে বাসাবাড়ি করে বউ-বাচ্চা নিয়ে আছি। ২০১৭ সালের পর থেকে যখন বেশি বৃষ্টি হয় তখনই ভয় লাগে। ওই সময় আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাই। এখান থেকে কই যাব। যাওয়ার কোনো জায়গা নেই আমাদের।’

নতুনপাড়া এলাকার আরেক বাসিন্দা মো. আলী হোসেন বলেন, ‘২০১৭ সালে পাহাড়ধসে আমার বড় ভাই মারা যায়। বিপদ জেনেও আমরা বাস করছি। মরলে এখানেই মরব আর বাঁচলে এখানেই বাঁচব।’

যুব উন্নয়ন এলাকার বাসিন্দা মনিময় চাকমা বলেন, ‘এখনো বর্ষা শুরু হলে শরীর থেকে প্রাণটা বের হয়ে যায়। রাতে বৃষ্টি শুরু হলে সারা রাত না ঘুমিয়ে জেগে থাকি। কখন কী হয় সেই চিন্তায়।’

রাঙামাটি দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি ওমর ফারুক বলেন, ‘পাহাড়ধস মোকাবেলায় দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হাতে নিয়ে সেই সব প্রকল্প দায়িত্বশীলতার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের পর যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠিত হয়েছে তাদের দেওয়া সুপারিশগুলোও বাস্তবায়ন ও অনুসরণ করতে হবে।’

রাঙামাটির জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, ‘স্থায়ী সমাধানের যেসব প্রস্তাব ছিল সেগুলো বাস্তবায়নে আরো সময় লাগবে।



সাতদিনের সেরা