kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

দেড় বছরেও হাইকোর্টকে তথ্য দেয়নি সরকার

ই-জুডিশিয়ারি

এম বদি-উজ-জামান   

১৪ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একটি হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত কুলসুম আক্তার ওরফে কুলসুমীর বদলে ভাড়া জেল খাটছেন হতদরিদ্র মিনু। আর পুলিশ কর্মকর্তা মামুন ইমরানকে পুড়িয়ে হত্যা মামলায় গোপালগঞ্জের এক আসামির পরিবর্তে ভাড়ায় জেল খাটছেন চাঁদপুরের আবু ইউসুফ লিমন। এ ছাড়া জাল জামিন আদেশ তৈরি করে কারাগার থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে আসামিরা। সম্প্রতি বগুড়ায় মোটর শ্রমিকদের সংঘর্ষের এক মামলায় ৩০ আসামির ক্ষেত্রে এমন ঘটনা ঘটেছে।

শুধু এই ঘটনাগুলোই নয়, এ রকম অসংখ্য ঘটনা ঘটছে বাংলাদেশে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজ করা গেলে অর্থাৎ ই-জুডিশিয়ারি করা গেলে এমন সব জালিয়াতি ঠেকানো যেত। সব আসামিকে কারাগারে রেখেই বিচারকাজ পরিচালনা করা যেত। ফলে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি করার সুযোগ সৃষ্টি হতো। কিন্তু এই ই-জুডিশিয়ারি নিয়ে দেড় বছর আগে হাইকোর্ট সরকারের পদক্ষেপ জানতে চাইলেও এখনো এর কোনো তথ্য হাইকোর্টকে দেয়নি সরকার। এ কারণে ই-জুডিশিয়ারি সম্পর্কে সরকারের কার্যক্রমের অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন হাইকোর্ট। অগ্রগতি কী আছে, তা আজ ১৪ জুনের মধ্যে জানাতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের বিচার বিভাগকে ডিজিটাইজ করতে ২০১৯ সালে করা এক রিট আবেদনের ওপর গত ১০ জুন শুনানিকালে এ আদেশ দেন হাইকোর্ট।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, সারা দেশে এখন প্রায় ৪০ লাখ মামলা বিচারাধীন। সুপ্রিম কোর্টের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত অধস্তন আদালতে ৩৪ লাখ ৬৪ হাজার ৯৯৮টি, হাইকোর্ট বিভাগে চার লাখ ৫২ হাজার ৯৬৩টি এবং আপিল বিভাগে ১৫ হাজার ২২৫টি মামলা বিচারাধীন। হাইকোর্টে প্রতিদিনই অসংখ্য মামলার নথি না পাওয়া যাওয়ায় শুনানি পিছিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন কারাগার থেকে আসামিদের আদালতে আনতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীকে ঝামেলায় পড়তে হয়। প্রিজন ভ্যান থেকে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটে।

এমন পরিস্থিতিতে মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি, বিচার বিভাগ ডিজিটাইজ করা, দেশের সব আদালত ভার্চুয়াল পদ্ধতির আওতায় আনা, বন্দিদের কারাগারে রেখেই ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়া পরিচালনা এবং সারা দেশে ই-কোর্ট রুম স্থাপন করার লক্ষ্যে আইন মন্ত্রণালয় ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। ২০২০ সালের জুন থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের জন্য দুই হাজার ৮৭৮ কোটি টাকা বরাদ্দও করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দেবে বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস)। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল গত ৩ জুন নতুন অর্থবছরের জন্য ঘোষিত বাজেট বক্তব্যে দেশের প্রতিটি আদালতকে ই-আদালতে পরিণত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।

বিচার বিভাগের ডিজিটাইজেশনের কাজ সম্পর্কে ৩০ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে দেড় বছর আগে ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্ট আইনসচিবকে নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে দেশের সব আদালতকক্ষে ই-জুডিশিয়ারির কার্যক্রম চালু করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিতে সরকারকে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত গৃহীত পদক্ষেপ সম্পর্কে আদালতকে কিছুই জানায়নি সরকার। এ প্রেক্ষাপটে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিমের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চ ই-জুডিশিয়ারি সম্পর্কে সরকারের কাছে অগ্রগতি জানতে চেয়েছেন।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অরবিন্দু কুমার রায় কালের কণ্ঠকে বলেন, আদালত ই-জুডিশিয়ারির অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন। আইনসচিবের সঙ্গে কথা বলে এ সম্পর্কে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ আদালতকে জানানো হবে।

রিট আবেদনকারী আইনজীবী অ্যাডভোকেট ফরহাদ উদ্দিন আহমেদ ভুইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, উন্নত বিশ্বে ই-জুডিশিয়ারি কিভাবে করা হয়েছে, এর সুফল কী তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করে ২০১৯ সালে একটি রিট আবেদন করি। এ বিষয়ে হাইকোর্ট ২০২০ সালের ১৯ জানুয়ারি রুল জারি করেন এবং সরকারের গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চান। ৩০ দিনের মধ্যে জানাতে আইনসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আজ পর্যন্ত সরকার এ সম্পর্কে আদালতকে কিছুই জানায়নি।

তিনি বলেন, ই-জুডিশিয়ারি করা গেলে অটোমেশন পদ্ধতিতে সব আদেশ বা রায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সহজেই জানিয়ে দেওয়া যাবে। আসামিদের কারাগারে রেখেই এভিডেন্স ক্যামেরার মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ করা যাবে। এটা করা গেলে আসামিকে আদালতে হাজির করার ঝামেলা থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। মামলাও দ্রুত নিষ্পত্তি হবে। ই-রেকর্ড রুম করা গেলে মামলার ফাইলের স্তূপ জমবে না।



সাতদিনের সেরা