kalerkantho

শুক্রবার । ২ আশ্বিন ১৪২৮। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১। ৯ সফর ১৪৪৩

ঊর্ধ্বমুখী সোনার দামে আতঙ্কে ব্যবসায়ীরাও

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১২ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে থাকায় আতঙ্কে রয়েছেন খোদ অলঙ্কার ব্যবসায়ীরাও। তাঁরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে দেশের বাজারেও বাড়াতে হবে। এতে দেশের বাজারে অলঙ্কারের ক্রেতা আরো কমে যাবে। করোনায় দেশের অলঙ্কার বাজারে চরম মন্দা চলছে। এর ওপর দাম আরো বাড়লে ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কষ্টকর হবে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লেও দেশের বাজারে না বাড়ানোর পক্ষে অলঙ্কারের ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানের মালিকরা। এ ছাড়া দেশের বাজারে অলঙ্কারের কাঁচামাল ‘সোনার বার’ সংকট কাটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে থাকা সোনা নিলামে বিক্রি করার কথাও বলছেন অনেকে। বিপাকে পড়া ক্রেতারাও বলছেন, বিয়েশাদিতে যেটুকু না দিলেই নয় এখন শুধু ততটুকুই কিনছেন। যদি দাম আরো বাড়ে তাহলে সেটুকু কেনাও বন্ধ রাখতে হবে।

বিশ্ববাজার পর্যালোচনা করে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়তে থাকায় দেশের বাজারে গত ২৩ মে চলতি মাসের দ্বিতীয় দফায় দাম বেড়ে ভালোমানের বা ২২ ক্যারেটের প্রতিভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) সোনা ৭৩ হাজার ৪৮৩ টাকায় ওঠে। এ ছাড়া ২১ ক্যারেট ৭০ হাজার ৩৩৩; ১৮ ক্যারেট ৬১ হাজার ৫৮৪ এবং সনাতন পদ্ধতির প্রতিভরি ৫১ হাজার ৬২ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এর আগে গত বছরের জুলাই মাসে বিশ্ববাজারে দাম আউন্স প্রতি দুই হাজার ৭০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে দেশের বাজারেও সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে আসে। ৬ আগস্ট দেশে সোনার সর্বোচ্চ দাম উঠেছিল ভরি প্রতি ৭৭ হাজার ২২৫ টাকা। সেই হিসাবে সোনার দাম আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বাজারে আবারও রেকর্ডের খুব কাছাকাছি রয়েছে।

দেশে যখন সর্বশেষ সোনার দাম বাড়ানো হয়, তখন বিশ্ববাজারে প্রতি আউন্স দাম ছিল এক হাজার ৮৮১ ডলার। গত এক সপ্তাহে তা বেড়ে এখন ১৯০৩.২০ ডলারে উঠেছে। অর্থাৎ দেশে বাড়ানোর পর বিশ্ববাজারে আউন্স প্রতি বেড়েছে ২২ ডলার।

বাংলাদেশ জুয়েলার্স সমিতির (বাজুস) সহসভাপতি ও সান্দা জুয়েলার্সের স্বত্বাধিকারী রঞ্জিত ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা সোনার দাম দ্রুতই না বাড়ানোর পক্ষে। তার পরও আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়লে দেশের বাজারে বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। ফলে ক্রেতার চেয়ে বেশি আতঙ্কে রয়েছি আমরা ব্যবসায়ীরা। কারণ করোনা এবং দাম বৃদ্ধির কারণে এমনিতেই অলঙ্কারের বিক্রি গড়ে ৫০ শতাংশ কমেছে। অনেক মধ্যবিত্ত কেনা ছেড়ে দিয়েছেন। অনেকে আগে যেখানে ১০ ভরি কিনতেন এখন দুই ভরি দিয়েই প্রয়োজন মেটাচ্ছেন। দাম আরো বাড়লে যেটুকু বিক্রি হচ্ছে তা-ও হবে না। ব্যবসা টিকিয়ে রাখাই কষ্টকর হবে। তাই আন্তর্জাতিক বাজারে আউন্স প্রতি অন্তত ৪৫ থেকে ৫০ ডলার না বাড়া পর্যন্ত দেশের বাজারে সমন্বয়ের চিন্তা করা যাবে না।’

দেশে অলঙ্কারের বড় বাজার বায়তুল মোকাররম ঘুরে দেখা যায়, আমিন জুয়েলার্স, গ্রামীণ জুয়েলার্স, সানন্দা জুয়েলার্স, ভেনাস জুয়েলার্সসহ বড় ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ক্রেতা রয়েছে হাতে গোনা কয়েকজন। এর মধ্যে ভারী গয়না কিনছেন খুব কম ক্রেতাই। ছোট ছোট দোকানগুলোতে অলস সময় পার করছেন বিক্রেতারা। নিচ তলায় আমিন জুয়েলার্সে গিয়ে কথা হয় আমেনা খাতুন (ছদ্ম নাম) নামে একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘মেয়ের বিয়ে ঠিক হয়েছে। গয়নার জন্য কিছু টাকা আলাদা করে রেখেছিলাম। কিন্তু যতটুকু কেনার ইচ্ছা ছিল ততটুকু কেনা যাচ্ছে না। দাম অনেক বেড়ে গেছে। তাই বাজেট আগের মতোই রয়েছে, সোনার পরিমাণ কমে গেছে।’

দেশের বাজারে দাম বৃদ্ধির বড় দুটি কারণ জানালেন বাজুস সভাপতি এনামুল হক। এর মধ্যে একটি হলো—আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি হওয়ায় পাচার ঠেকাতে দেশের বাজারে সমন্বয়। দ্বিতীয়টি হলো বুলিয়ান মার্কেটে অলঙ্কারের কাঁচামাল ‘সোনার বার’ ঘাটতি। তিনি বলেন, আমদানিতে শুল্ক জটিলতা (উপকরণ কর রেয়াত), বিএসটিআইয়ের বাধ্যতামূলক অনুমোদন এবং নানা ধরনের দাপ্তরিক জটিলতায় ব্যবসায়ীরা বৈধভাবে সোনার বার আমদানি করতে পারছেন না। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট বন্ধ থাকায় ব্যাগেজ রুলেও কোনো সোনা আসছে না। এতে চাহিদার বিপরীতে জোগান কম থাকায় দেশীয় বুলিয়ান/পোদ্দার মার্কেটে সোনার দাম বেড়েছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধির বিষয়ে সোনা ব্যবসায়ীরা জানান, বিশ্বে বিভিন্ন দেশের দায়িত্বশীল এজেন্ট ও বায়াররা সোনার বাজারের মূল নিয়ন্ত্রক। যখনই বিশ্ব সংকটের মুখে পড়ে তখন নিজ দেশের অর্থনীতি স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও অনুমোদিত লোকাল এজেন্টরা ক্রেতা সেজে হাজার হাজার কেজি সোনা কিনে মজুদ রাখেন। এভাবে সব দেশ যখন এক সঙ্গে বিপুল পরিমাণ সোনা কেনে তখন এর দামও বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে করোনাভাইরাসের প্রকোপ, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন উত্তেজনা, ভারতের সোনা আমদানি হ্রাস ইত্যাদি কারণে এই মজুদকারীদের কার্যক্রম বেড়েছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, সাধারণ ভোক্তা পর্যায়ে সোনার কেনাকাটা হয় গয়নাসামগ্রীতে। এই শ্রেণির ক্রেতার কাছে গয়নাসামগ্রীর চাহিদা গত বছরের তুলনায় চলতি বছর কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। আবার বৈশ্বিকভাবে সোনার সরবরাহ কমেছে ৩ শতাংশের মতো।



সাতদিনের সেরা