kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ আশ্বিন ১৪২৮। ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৩ সফর ১৪৪৩

আবার পিয়ালী ফিরবে পাতে

বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের সাফল্য

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১০ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আবার পিয়ালী ফিরবে পাতে

একসময় পদ্মা, যমুনা, বাঙ্গালী ও আত্রাই নদীতে প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত পিয়ালী মাছ। অতি আহরণ আর পরিবেশগত বিপর্যয়ের কারণে বর্তমানে সংকটাপন্ন মাছের তালিকায় ঠাঁই নিয়েছে সুস্বাদু এই মাছ। তবে সুসংবাদ হলো, প্রথমবারের মতো এই মাছের প্রজনন ও পোনা উত্পাদনের কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা। ইনস্টিটিউটের বগুড়া জেলার সান্তাহার প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রের বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণায় এই সাফল্য আসায় এখন পিয়ালী মাছের পোনা পাওয়া সহজ হবে এবং চাষের আওতায় আনা যাবে।   

বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহ সদর দপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। গবেষকদলে ছিলেন উপকেন্দ্রের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ডেভিড রিন্টু দাস, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান ও মালিহা খানম।

পিয়ালী মাছ এলাকাভেদে জয়া, পিয়ালী বা পিয়াসী নামে পরিচিত। এই মাছ মিঠা পানির মাছ। বাংলাদেশ (পদ্মা, যমুনা এবং এগুলোর শাখা নদীতে), ভারত (আসাম, উত্তরাঞ্চল, উত্তর প্রদেশ), পাকিস্তান, নেপাল, ইরান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও আফগানিস্তানে এ মাছের বিস্তৃতি রয়েছে। পিয়ালীর দৈর্ঘ্য ৫ থেকে ১৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর দেহ লম্বা এবং পাশের দিকে চাপা। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ মাছের পেট হলুদাভ থাকে এবং স্ত্রী মাছের চেয়ে আকারে অপেক্ষাকৃত বড় হয়। স্ত্রী মাছের পেট ধবধবে সাদা ও হালকা স্ফীতকায়। প্রতিবছর এ মাছের আঁশ ঝরে যায় এবং নতুন আঁশ তৈরি হয়।

যমুনা, বাঙ্গালী, আত্রাই নদীসহ বিভিন্ন উত্স থেকে পিয়ালী মাছের পোনা সংগ্রহ করে মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতাধীন বগুড়ার সান্তাহারে প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রের পুকুরে নিবিড়ভাবে প্রতিপালন করা হয়। এ সময় পিয়ালীর খাদ্য ও খাদ্যাভ্যাস পর্যবেক্ষণ করে সে অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করা হয়। এ প্রজাতির মাছ সাধারণত বর্ষাকালে অগভীর জলাশয়ে প্রজননে অংশগ্রহণ করে থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, মে থেকে আগস্ট এবং ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসে নদীতে প্রজননক্ষম পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী মাছ পাওয়া যায় এবং জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাসে জলাশয়ে পিয়ালীর পোনার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। এতে প্রমাণিত হয়, পিয়ালীর সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম হচ্ছে মে থেকে আগস্ট এবং ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি। পিয়ালী মাছের ডিম ধারণক্ষমতা আকারভেদে এক হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার ৫০০টি। ইনস্টিটিউটের চলমান এই গবেষণায় পাঁচ জোড়া পিয়ালী মাছকে চলতি জুন মাসে হরমোন প্রয়োগ করা হয়। হরমোন প্রয়োগের ছয় থেকে আট ঘণ্টা পর ডিম ছাড়ে এবং ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা পরে নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু পোনা উত্পাদিত হয়। ডিম নিষিক্ততার পরিমাণ ছিল প্রায় ৭৬ শতাংশ। উত্পাদিত রেণু বর্তমানে ইনস্টিটিউটের প্লাবনভূমি উপকেন্দ্রের হ্যাচারিতে প্রতিপালন করা হচ্ছে।

পিয়ালী মাছের প্রজনন সফলতা সম্পর্কে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, ‘দেশি মাছ রক্ষার্থে ইনস্টিটিউটের গবেষণা কার্যক্রম কয়েক বছর ধরে জোরদার করা হয়েছে। চলতি বছর ইনস্টিটিউটের পক্ষ থেকে ১০টি দেশি প্রজাতির মাছের প্রজনন কৌশল উদ্ভাবনের লক্ষ্যে গবেষণা কার্যক্রম হাতে নিই। আশার কথা, আমরা এরই মধ্যে ঢেলা, বাতাসী, লইট্যা, ট্যাংরা, পুইয়া ও পিয়ালী মাছের প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন করতে পেরেছি। সামনে আরো চমক আসছে।’

দেশীয় বিলুপ্ত প্রজাতির সব ছোট মাছকে পর্যায়ক্রমে ভোক্তাদের পাতে ফিরিয়ে আনা হবে বলে মহাপরিচালক উল্লেখ করেন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকেও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জানান।

গবেষকদলের প্রধান ড. ডেভিড রিন্টু দাস জানান, পিয়ালী মাছ দ্রুত বর্ধনশীল এবং খেতে খুবই সুস্বাদু। এই মাছ আমিষ, চর্বি, ক্যালসিয়াম ও লৌহসমৃদ্ধ। ক্যালসিয়ামের অভাব পূরণে এই মাছ অত্যন্ত কার্যকর।



সাতদিনের সেরা