kalerkantho

মঙ্গলবার । ১০ কার্তিক ১৪২৮। ২৬ অক্টোবর ২০২১। ১৮ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

বৃষ্টি হলেই ঢাকা ডোবে যে কারণে

‘জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে, যার অনেকগুলোই এখন আর সমাধানযোগ্য নয়।’

সজিব ঘোষ   

৯ জুন, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



এখনো আসেনি বর্ষাকাল। এরই মধ্যে এবারও গত কয়েক দিন কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে রাজধানী ঢাকার অলিগলি ও প্রধান সড়ক ডুবে থইথই দৃশ্যের দেখা মিলেছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে, এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। এই দুঃখ আর বেশিদিন থাকবে না—দায়িত্বশীলরা এমন আশ্বাস দিলেও কার্যত বাস্তবের সঙ্গে এর মিল দেখা যায় না। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা ফেলা, বর্ষার আগমুহৃর্তে সড়কে খোঁড়াখুঁড়ি, নদী ভরাট, খাল দখল, অপরিকল্পিত বক্স কালভার্ট, সমন্বয়হীন সংস্কারকাজ এবং প্রতিবছরই সড়ক উঁচু করার মতো কাজগুলো জলাবদ্ধতার জন্য প্রাথমিকভাবে দায়ী। এই জলাবদ্ধতার সঙ্গে অনেক কারণ ও একাধিক প্রতিষ্ঠানের দায় থাকায় দ্রুতই এর সমাধান হবে, এমন আশাও করছেন না সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ প্ল্যানার্স ইনস্টিটিউটের সাধারণ সম্পাদক ড. আদিল মুহাম্মদ খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢাকার যে অবস্থা এতে অতিবৃষ্টির প্রয়োজন নেই, অল্প বৃষ্টিই যথেষ্ট। এই জলাবদ্ধতার পেছনে একাধিক কারণ জড়িত, যার অনেকগুলোই এখন আর সমাধানযোগ্য নয়। চাইলেই সহজে আর ভবন ভেঙে নতুন করে পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তাই ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে কেন্দ্রীয় ঢাকার জলাবদ্ধতা কখনো নিরসন করা সম্ভব বলে মনে হয় না। আমরা এখানে বেশি বাজে অবস্থা তৈরি করে ফেলেছি। এখন আমাদের ঢাকার বর্ধিত অংশের দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত।’

তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় নগর এলাকার পুরোটাই অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে। একটা নগরে ২০-২৫ শতাংশ রাস্তা থাকা লাগে, তেমনি ২০ শতাংশের মতো ফাঁকা জায়গা ও সবুজ এলাকা এবং ১৫ শতাংশ জলাশয় থাকা লাগে। আমরা এই মৌলিক পরিকল্পনাটাই মানি নাই। আমরা পুরোটা কংক্রিটই বানিয়ে ফেলেছি। ড্রেন হয়ে গেছে সরু, এখানে আবার আবর্জনা ফেলা হয়। খালগুলো দখল, এক পাশে উচ্ছেদ করলে আরো ১০ পাশে দখল হচ্ছে। বহু খালের জমিতে পাকা ভবন উঠে গেছে। মুখে মুখে কথা বলে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। অনেক আইনি জটিলতাও আছে। তবু যদি শতভাগ রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকে এবং পূর্ণ শ্রমে কাজ করা হয় তাহলেও জলাবদ্ধতার ন্যূনতম সমাধান পেতে অন্তত ১০ বছর সময় লাগবে।’

আরেক নগর পরিকল্পনাবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সমস্যার শুরুটা গোড়াতে। শুরু থেকেই আমরা ভুল করে এসেছি। তাই জলাবদ্ধতার সমস্যা এখনই সমাধান হচ্ছে না। নব্বইয়ের দশকে আমরা যখন ঢাকা শহর নিয়ে পরিকল্পনা করি, তখন বলা হতো, ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে মাটি, গাছপালা ও ফাঁকা জমিতে ৫০ মিলিমিটার পানি টেনে নেবে। বাকি ৫০ মিলিমিটার পানি সরানোর জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এখন তো ঢাকা পাকা হয়ে গেছে। তাই এখন ৫০ মিলিমিটারের বেশি বৃষ্টি হলেই ড্রেনের পানি সড়কে উঠে তা খালে পরিণত হয়। এই শহরে এখন আর মাটি নেই।’

ইকবাল হাবিব বলেন, ‘নব্বইয়ের দশকের আগে এই শহরে ড্রেনেজব্যবস্থাই ছিল না। তখন ঢাকা শহর এতটা ঢাকা ছিল না। ধারণা ছিল, বৃষ্টির পানি সহজেই নদীতে চলে যাবে। কিন্তু এখন হচ্ছেটা কী। তখনকার পরিকল্পনা শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে, এমটা মেনে নিলেও ঢাকা শহরে জলজট হবে। শহরের পানি ধারণের ক্ষমতা কমেছে, ফাঁকা জায়গা নেই। ঢাকাকে আমরা ঢেকে ফেলেছি। পানি তো নদীতে যেতে পারছে না। উল্টো দিকে গত ২০ বছরে ৩৭ শতাংশ সবুজ জায়গা কমেছে। খাল দখল, নদী ভরাটের সঙ্গে বর্জ্য ব্যবস্থাপনাও দায়ী। সব মিলিয়ে এই জলাবদ্ধতার সমস্যা দ্রুতই নিরসন করা সম্ভব হচ্ছে না।’

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপক এয়ার কমোডর বদরুল আমিল বলেন, ‘বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় একটা সমন্বয়হীনতা রয়েছে, এটা সত্য। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি। ছোট গাড়িতে করে এলাকা এলাকা থেকে ময়লা তুলে সেগুলো নদীর পাশে ফেলা হয়, এমন ঘটনা আমরা মনিটরিং করছি। জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ হচ্ছে সমন্বয়হীনতার অভাব। আগে একেক প্রতিষ্ঠান একেকটার দায়িত্ব পালন করত, এখন অনেক কিছু সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে এসেছে। সিটি করপোরেশন কাজ শুরু করেছে। ড্রেন বন্ধ হলে পানির প্রবাহ নষ্ট হয়, তাই পলিথিনের ব্যবহার ও যত্রতত্র ময়লা ফেলার ব্যাপারে সাধারণ মানুষকেও সচেতন হতে হবে।’



সাতদিনের সেরা