kalerkantho

বুধবার । ৪ কার্তিক ১৪২৮। ২০ অক্টোবর ২০২১। ১২ রবিউল আউয়াল ১৪৪৩

মুন্সীগঞ্জের লৌহজং

চাঁদা তুলে ভাঙন রোধের চেষ্টা

মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ   

২৮ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চাঁদা তুলে ভাঙন রোধের চেষ্টা

বরাদ্দ আসবে, টেন্ডার হবে, তারপর কাজ শুরু হবে—এই দীর্ঘসূত্রতার জাঁতাকলে পড়ে ভিটামাটি হারাতে চায় না স্থানীয়রা। তাই চাঁদা তুলে নিজেরাই নিজেদের রক্ষার চেষ্টা করছে। মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ের বেজগাঁও এলাকা থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বর্ষা মৌসুম শুরু না হতেই উত্তাল হয়ে উঠছে মুন্সীগঞ্জ-বিক্রমপুর এলাকার পদ্মা। ফলে ভাঙন আতঙ্কে পদ্মা পারের মানুষের চোখে ঘুম নেই। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে পাল্টে গেছে পদ্মার রূপ। প্রবল ঢেউয়ের আঘাতে ভাঙন শুরু হয়েছে পদ্মাতীরের গ্রামগুলোয়। প্রতিবছর বর্ষা এলেই প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনগণকে বলা হয়, শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়া হবে। অথচ গত কয়েক বছরেও এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি প্রশাসন। নদীতীরে বালু ভর্তি কিছু জিও ব্যাগ ফেলে দায়িত্ব শেষ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। এ পরিস্থিতিতে চলতি বছর পদ্মাতীরের ভাঙনরোধে এলাকাবাসী চাঁদা তুলে বাঁধ নির্মাণ করছে। যদিও অনেকে বলছেন, এই চেষ্টা বৃথা যাবে। এমন অবস্থায় আশার কথা শুনিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি।

গতকাল বৃহস্পতিবার সরেজমিনে লৌহজংয়ের পদ্মা পারের বেশ কিছু গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে উত্তাল পদ্মা। প্রবল ঢেউ আছড়ে পড়ছে নদীতীরের গ্রামগুলোয়। অসময়ে পদ্মাতীরে ভাঙন দেখা দেওয়ায় হুমকিতে পড়েছে লৌহজং উপজেলার অসংখ্য গ্রাম। ফলে এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক। উপজেলার পদ্মা পারের গাঁওদিয়ার শামুর বাড়ি, দক্ষিণ হলদিয়া, খড়িয়া, কনকসার, লৌহজং-তেউটিয়া, বেজগাঁও, কান্দিপাড়া, জশলদিয়াসহ আরো অনেক গ্রামে ভাঙন দেখা দিয়েছে। গত বছরও এসব এলাকায় ব্যাপক ভাঙন দেখা দিয়েছিল। ওই সময় শিমুলিয়া ফেরিঘাটসংলগ্ন পদ্মা সেতুর কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে ভাঙনের ফলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ওই সময় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল শুষ্ক মৌসুমে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে দেওয়া হবে। কিন্তু পরে কিছুই করা হয়নি। ইয়াসের প্রভাবে প্রবল ঢেউয়ে গত দুই দিনে ভেঙেছে শিমুলিয়া ফেরিঘাট।

ভাঙন ঠেকাতে এলাকাবাসী চাঁদা তুলে জিও ব্যাগ ভর্তি বালু ফেলে এবং বাঁশের খুঁটি দিয়ে বাঁধ নির্মাণের চেষ্টা করছে। বেজগাঁওয়ের হোসেন সর্দারের উদ্যোগে এই প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। এরই মধ্যে বেশ কিছু এলাকজুড়ে নির্মাণ করা হয়েছে বাঁধ।

হোসেন সর্দার জানান, এ বছর বর্ষা শুরুর আগেই তাঁদের বেজগাঁও এলাকায় ভাঙন শুরু হয়েছে। প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় নিজেদের বাড়িঘর রক্ষায় চাঁদা তুলে বালুর বস্তা ফেলে ভাঙন রোধে চেষ্টা করা হচ্ছে।  তিনি আরো জানান, ৭০ হাজার টাকা চাঁদা তুলে সেই টাকা দিয়ে বালু ও বাঁশ কিনে ভাঙন রোধে কাজ করা হচ্ছে। তবে এইটুকু বাঁধে কিছু হবে না। সরকার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে না দিলে একদিন হয়তো লৌহজং মানচিত্র থেকে হারিয়ে যাবে।

বাদশা মিয়া নামে ওই এলাকার আরেকজন বাসিন্দা জানান, বালু ফেলে ভাঙন রোধ সম্ভব নয়। তার পরও তাঁরা চেষ্টা করছেন। সরকার স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করে না দিলে লৌহজংয়ে পদ্মার ভাঙন ঠেকানো অসম্ভব।

শামুরবাড়ী গ্রামের শাহিন ফকিরের বাড়িটির অর্ধেক এরই মধ্যে পদ্মার গর্ভে চলে গেছে। বাকি অংশও এখন আবার ভাঙতে শুরু করেছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘আমরা নদী পারের পাঁচ শতাধিক পরিবার আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছি।’

বর্তমানে গাঁওদিয়া থেকে লৌহজং-তেউটিয়া ইউনিয়নের বাঘের বাড়ি পর্যন্ত পদ্মার প্রবল ঢেউয়ে ভাঙন অব্যাহত আছে। চার কিলোমিটার এই এলাকায় প্রতিনিয়ত বিলীন হচ্ছে বসতবাড়ি, ফসলি জমি, খেলার মাঠ, মসজিদ, মাদরাসা, প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ নানা স্থাপনা। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও বেগ ফেলার উদ্যোগ নিলেও তাতে কাজ হচ্ছে না। অনেক জায়গায় জিও বেগ ফেলার পর নতুন করে সেসব এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে। বেজগাঁওয়ের মৃধা বাড়ি, শামুরবাড়ীর ইউনাইটেড হাসপাতালের ইউনুছ খান-মাহমুদা খানম মেমোরিয়াল কমপ্লেক্সটি এখন পদ্মার ভাঙনের মুখে। দৃষ্টিনন্দন আরো কয়েকটি বাড়ি পদ্মার ভাঙনের মুখে রয়েছে। গত বছরের ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পদ্মা রিসোর্টটির আংশিক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ-২ (লৌহজং-টঙ্গিবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক সাগুফতা ইয়াসমিন এমিলি জানান, লৌহজং-টঙ্গিবাড়ীর পদ্মার ভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এটি বর্তমানে একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টি অবগত আছেন। এ নিয়ে কথাও বলেছেন। গত বছর থেকে করোনার কারণে কাজটি  একটু বিলম্ব হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রনেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী কালের কণ্ঠকে বলেন, গত বছর নেওয়া স্থায়ী বাঁধ প্রকল্পটি যাচাই-বাছাই শেষে ৮.৪ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ৯.১০ কিলোমিটার করা হয়েছে। প্রকল্পটি এরই মধ্যে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির সভায় পাস হয়েছে। গত ১১ মার্চ এটি পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। শিগগিরই তা এননেকের সভায় উঠবে। আগামী শুষ্ক মৌসুমের আগে এই স্থায়ী বাঁধের কাজ শুরু করা সম্ভব নয়। এই এক বছর লৌহজংবাসীকে পদ্মার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হবে।



সাতদিনের সেরা