kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

করোনায় বৃদ্ধাশ্রমের দিনলিপি-শেষ পর্ব

‘মন চাইলে দেখে যেও বোঝা হতে চাই না’

এক বুক কষ্ট নিয়ে স্ত্রীকে ফোন

মোবারক আজাদ   

২৩ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বশির উল্লাহর (৫২) বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির মাইজমাণ্ডারী এলাকায়। অন্য সাধারণ ১০ জনের মতোই স্বাভাবিক জীবন কাটছিল তাঁর। ১৯৯২ সালে নাজিরহাট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করে ১৯৯৪ সালে পাড়ি জমান প্রবাসে। প্রবাসজীবন শেষে ২০০৪ সালে দেশে এসে কাজ শুরু করেন রাজধানীর গুলশানের একটি থ্রি স্টার হোটেলের সুপারভাইজার পদে। ২০০৫ সালে বিয়ে করেন। ২০১৩ সালের পর বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট কম্পানিতে চাকরি করেছেন। এভাবে চলছিল বশিরের সংসার। ২০১৮ সালে শরীরে বাসা বাঁধে টিউমার। এক পর্যায়ে প্যারালাইজড হয়ে পড়েন। সামর্থ্য অনুযায়ী চেষ্টা করেও সুস্থতার আলো দেখেননি। আস্তে আস্তে একসময় স্ত্রী ও ভাইয়ের স্ত্রীদের অবহেলা শুরু হয়। বশির বৃদ্ধা মা-বাবার বোঝাও হতে চাননি; গত বছর চলে আসেন ঢাকায়। অবশেষে ঠাঁই মেলে একটি  বৃদ্ধাশ্রমে।

আট ভাই-বোনের মধ্যে সংসারের বড় সন্তান হিসেবে বশির সবচেয়ে বেশি শ্রম দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর দুঃসময়ে কেউই পাশে দাঁড়ায়নি। বৃদ্ধাশ্রমে আসার পর থেকে পরিবার একবার খোঁজও নেয়নি। তিনিও যোগাযোগ করার চেষ্টা করেননি। সম্প্রতি মিরপুরের দক্ষিণ পাইকপাড়ার ওল্ড এইজ অ্যান্ড চাইল্ড কেয়ার বৃদ্ধাশ্রমে নিজের করুণ গল্প শোনালেন বশির। জানালেন, সম্প্রতি তিনি স্ত্রীকে ফোন করে বৃদ্ধাশ্রমে অবস্থানের কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, ভালো আছেন, মন চাইলে যেন এসে তাঁকে দেখে যাওয়া হয়।

বশিরের কথায়, প্রবাসে থাকার সময় সবার আবদারই সাধ্যমতো পূরণ করেছেন। ভাই-বোনদের যাবতীয় দেখাশোনা, বাড়ি করাসহ সবার প্রয়োজন মিটিয়ে দেশে ফিরে দেখেন নিজের সম্পত্তি বলতে তেমন কিছু নেই। এরপর দেশেও কাজকর্ম করেই চলেছেন। কিন্তু দুঃসময়ে পরিবারকে কাছে না পেয়ে এক বুক কষ্ট নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় পেতেছেন।

বৃদ্ধাশ্রমে কেমন আছেন, ভবিষ্যৎ ইচ্ছা কী—এমনসব প্রশ্নের উত্তরে বশির বললেন, ‘আপনজনের অবহেলায় আজকে এখানে ঠাঁই নিতে হয়েছে। আসার পর কাউকে জানাইনি। তারাও খোঁজ নেয়নি। কয়েক দিন আগে স্ত্রীকে বলেছি এখানে আছি, ভালো আছি। মন চাইলে এসে দেখে যেও। আমি কারো বোঝা হতে চাই না। সে (স্ত্রী) ঢাকার লালবাগে বড় লোক পরিবারে বাবার বাড়িতে ভালোই আছে। আমার ভাই-বোনের কোনো দোষ নেই। আমার ভাইয়ের স্ত্রীরা ও আমার স্ত্রীর নানা রকমের বিদ্রুপের কারণে রাগ করে বাড়ি থেকে চলে এসেছি। আমার দুই কন্যাসন্তান আছে।’

এখন স্ত্রী ও পরিবারের লোকজন নিতে চাইলে যাবেন কি না—এই প্রশ্নের উত্তরে বশির বলেন, ‘গেলে কী হবে! আমার স্ত্রীর অবহেলায় আমার আজ এ অবস্থা। আর ভাইয়ের স্ত্রীরা কিছুদিন সেবাযত্ন করে আমার যে অল্প ভিটেমাটি আছে, সেটা লিখে নেবে। পরে আমার মেয়ে দুটির বিয়েশাদি বা তাঁদের ভবিষ্যতের কী হবে? তাই ঠিক করেছি, আর যাব না। স্ত্রীকে বলেছি, মেয়ে দুটিকে নিয়ে যেন তার মতো করে ভালো থাকে। আমিও ভালো আছি। প্রায়ই জীবনের হিসাব মেলাতে থাকি, একটি সময় আর হিসাব মেলে না। তবু বারবার মেলানোর চেষ্টা করি, কেন এমন হলো!’

শতবর্ষী বিবি খাদেজার গল্প : এই বৃদ্ধাশ্রমেই সাত বছর ধরে আছেন শতবর্ষী বিবি খাদেজা। শুদ্ধালাপী এই বৃদ্ধার বাড়ি ছিল নারায়ণগঞ্জ। স্বামী মিষ্টি দোকানের কারিগর ছিলেন। সাধ্যের মধ্যে সুখেই কেটেছে দাম্পত্য জীবন। একটি সন্তানের জন্ম হলেও ছোটকালেই মারা যায়। দুই দশক আগে মারা যান স্বামী। এরপর রাজধানীর এক বাসায় কাজ করে জীবন চলছিল খাদেজার। এর মধ্যে এক আত্মীয়র গ্রামের বাড়িতে গাছ থেকে নারিকেল পড়ে তাঁর একটি হাত ভেঙে যায়। এরপর ঢাকায় ফিরলে গৃহকর্তা তাঁর হাত ভাঙা ও বয়স বিবেচনায় তাঁকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে দেন। পরে সন্তান ও ভাই-বোনহীন খাদেজার খবর রাখেনি আত্মীয়স্বজন।

এই বৃদ্ধাশ্রমে শুধু খাদেজা আর বশির উল্লাহ নয়, তাঁদের মতো আরো ১০৫ জনের করুণ কাহিনি আছে। কেউ এখানে আশ্রিত হয়েছেন পরিবারের অবহেলায়। মানসিক ভারসাম্য হারিয়েও অনেকের ঠাঁই হয়েছে এখানে। কেউবা আবার অযত্ন-অবহেলায় রাস্তায় পড়েছিলেন। কিন্তু এমন করুণ পরিস্থিতির শিকার অনেকেই এখনো পড়ে আছেন অনাদরে-অবহেলায় দেশের বিভিন্ন স্থানে। তাঁদের অন্তত বৃদ্ধাশ্রমের সেবা নিশ্চিত করতে হলে সমাজের আরো বিত্তবানের এগিয়ে আসার প্রয়োজন।