kalerkantho

শুক্রবার । ৯ আশ্বিন ১৪২৮। ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২১। ১৬ সফর ১৪৪৩

রাজধানীতে চার মাসে ৫২ নারী-শিশুর প্রাণহানি

পারিবারিক সহিংসতা

মোবারক আজাদ   

২০ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



সাত বছর প্রেমের পর দুই বছর আগে বিয়ে করেন টাঙ্গাইলের মির্জাপুরের রাইসুল আলম সৌরভ (৩১) ও শাকিলা পারভিন (২৮)। বিয়ের পরপরই সুন্দর জীবনের আশায় রাজধানীতে পাড়ি জমান তাঁরা। কিছুদিনের মধ্যে ছোটখাটো নানা বিষয় নিয়ে বনিবনা কমতে শুরু করে তাঁদের। এর মধ্যে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া সৌরভ মাদকাসক্ত হয়ে পড়েন। সম্পর্ক আরো বিষিয়ে যায়। সর্বশেষ গত ২৭ এপ্রিল খাবারে লবণ কম-বেশি হওয়া নিয়ে ঝগড়া বাঁধে এই দম্পতির। ওই দিনই রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট পশ্চিম মানিকদির বাসা থেকে শাকিলার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

২১ এপ্রিল হাজারীবাগে রায়েরবাজারের টিলাবাড়ী এলাকার মাছ ব্যবসায়ী টিটু মিয়া তাঁর স্ত্রী সাজেদা বেগমকে (১৮) ঝগড়ার এক পর্যায়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। শ্বশুরবাড়ি থেকে পাঁচ লাখ টাকা এনে দিতে না পারায় এ হত্যাকাণ্ড বলে জানায় পুলিশ। এর আগে ৯ এপ্রিল রাজধানীর কদমতলীতে স্বামীর দ্বিতীয় বিয়ে নিয়ে কলহের জেরে আত্মহত্যা করেন গৃহবধূ রাহা আক্তার রীজা (২১)।

চলতি মাসের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) এক রাজধানীতেই শাকিলাদের মতো ৫২ জন নারী ও শিশু পারিবারিক সহিংসতার বলি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি শিশু (তিন থেকে ১৭ বছর বয়সী) ও সাত নারীর ক্ষেত্রে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। ১৭টিতে (১২ জন গৃহবধূ ও পাঁচ শিশু) আত্মহত্যা ঘটনা বলা হচ্ছে। অন্যদিকে ১৫ জন নারী-শিশুর মৃত্যুর কারণ স্পষ্ট হয়নি।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দাবি, সার্বিক দিক বিবেচনায় আগের তুলনায় ফৌজদারি অপরাধ কমছে। তবে করোনাকালে পারিবারিক নির্যাতন বেড়েছে।

এর কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক পরিবর্তন, পারিবারিক মূল্যবোধ ও বন্ধন অনেকটা ভেঙে গেছে। আর মহামারির কারণে মানুষের আয় অনেকটা কমেছে। ফলে পরিবারের সদস্যরা এক ধরনের চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে ইনডোর অপরাধগুলো বেড়েছে। এ জন্য পারিবারিক বন্ধন জোরদারের পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সভাপতি খন্দকার ফারজানা রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে স্বামী-স্ত্রী মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খুবই সচেতন থাকেন এবং ছেলে-মেয়েদের কাউন্সিলিং করা হয়। কিন্তু আমাদের দেশের মানসিক সমস্যাগুলো সেভাবে চিহ্নিত করি না এবং মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে ডাক্তারের কাছে যাই না। এ ছাড়া সমাজের বিভিন্ন বিশৃঙ্খল পরিবেশ মানুষের মানসিক সমস্যা এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।’

আর সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ‘পরিবার হোক কিংবা এর বাইরে যখন মানুষের অতিরিক্ত চাহিদার তুলনায় প্রাপ্তিটা কম হয়, তখন একটা শূন্যতা তৈরি হয়। আর এ থেকে আত্মহত্যা বা হত্যার মতো ঘটনাগুলো ঘটে থাকে। বিশ্বায়নের যুগে মানুষের মধ্যে লোভ ও উচ্চাভিলাষ বাড়ছে। অন্যদিকে কমছে নৈতিকতা।’

পারিবারিক সহিংসতাসহ সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম বলেন, ‘তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করেই বেশির ভাগ পারিবারিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে। ফলে খুনখারাবিও বেড়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা হচ্ছে।’ এ ছাড়া যেকোনো ধরনের অপরাধ নির্মূলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।



সাতদিনের সেরা