kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২১ শ্রাবণ ১৪২৮। ৫ আগস্ট ২০২১। ২৫ জিলহজ ১৪৪২

‘মা-বাবার সাথে ঈদ করতে চাই’

বুড়িমারীতে কোয়ারেন্টিনে অর্ধশত শিশু-কিশোর

হায়দার আলী বাবু, বুড়িমারী থেকে ফিরে   

১২ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



চট্টগ্রামের মেয়ে অর্পিতা চৌধুরী (১৬) লেখাপড়া করে ভারতের দার্জিলিংয়ের একটি বোর্ডিং স্কুলে। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার পর সেখানকার স্কুলগুলো বন্ধ করে দেওয়ায় তখন থেকে সে দেশেই ছিল। কিন্তু কিছুদিন আগে ফাইনাল পরীক্ষার জন্য স্কুল থেকে ডাক পড়লে ওই শিক্ষার্থী সশরীরে স্কুলে যায়। কিন্তু টেস্ট পরীক্ষার পরপরই আবারও স্কুল বন্ধ ঘোষণা করে শিক্ষার্থীদের দেশে চলে যেতে বলা হয়। কিন্তু ভারত থেকে করোনার বিস্তার রোধে তত দিনে বাংলাদেশ সরকার সীমান্ত বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে অর্পিতাকে দার্জিলিং থেকে যেতে হয় কলকাতা। সেখান থেকে ডেপুটি হাইকমিশনারের অনাপত্তিপত্র এবং করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে অবশেষে গত রবিবার দুপুরের দিকে বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে দেশে ঢুকতে পেরেছে সে। তবে সে পরিবারের কাছে যেতে পারেনি। অন্য অনেকের সঙ্গে তাকে রাখা হয়েছে লালমনিরহাট শহরের একটি আবাসিক হোটেলে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে।

বুড়িমারী স্থলবন্দর ইমিগ্রেশনে কথা হলে অর্পিতার বক্তব্য ছিল এমন, ‘১৪ দিনের চেষ্টার পর অনাপত্তি সনদ ও করোনা নেগেটিভ সনদ নিয়ে দেশে এলেও আমাদের ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে রাখা হচ্ছে। আমাকে নিতে এখানে মা-বাবা আসেনি। আবার মেয়ে হওয়ায় নানা ধরনের সমস্যাও হতে পারে। সব কিছু মিলে আমি ও আমার পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছি।’

শুধু অর্পিতা নয়, ওই দিন তার সঙ্গে এসেছে আরো দুটি মেয়েসহ মোট পাঁচজন। আর গত কয়েক দিনে বুড়িমারী স্থলবন্দর দিয়ে দেশে এসেছে অর্ধশতাধিক শিক্ষার্থী। তাদের বেশির ভাগেরই বয়স সর্বোচ্চ ১৬ বা ১৭ বছর। এসব শিশু-কিশোর ভারতের দার্জিলিং, কার্সিয়াং বা শিলিগুড়ির মতো বিভিন্ন এলাকার বোর্ডিং স্কুলে লেখাপড়া করে। তাদের বেশির ভাগের বাড়ি ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায়।

ইমিগ্রেশন সূত্র জানায়, গত ২৮ এপ্রিল থেকে ভারতে পড়ুয়ারা দেশে আসতে শুরু করেছে। তাদের বুড়িমারী স্থলবন্দর এলাকার দুটি আবাসিক হোটেল ও দুটি ডাকবাংলো এবং পাটগ্রাম পৌর শহরের আবাসিক হোটেলে প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টিনে রাখা হয়েছে। সেখানেও জায়গা সংকুলান না হওয়ায় এখন ভারতফেরত শিশুসহ অন্যদের পাঠানো হচ্ছে ১০০ কিলোমিটার দূরের লালমনিরহাট শহরে। কে কোথায় অবস্থান করছে শুধু সেটাই নির্দিষ্ট করে দিচ্ছে প্রশাসন। বাকিটা করতে হচ্ছে নিজেদের ব্যবস্থাপনায়। ফলে নানা দুর্ভোগে পড়েছেন শিশু-কিশোর শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিধি-নিষেধে আটকে পড়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে হাতে গোনা কয়েকজনের অভিভাবক বুড়িমারী এসেছিলেন সন্তানদের বাড়ি নিয়ে যেতে। তাঁরাও আটকে গেছেন ‘কোয়ারেন্টিনে’। বাদ বাকি শিশু-কিশোররা রয়েছে একদম পরিবারের লোকজন ছাড়া। যাদের অনেকের ঈদের দিনও থাকতে হবে কোয়ারেন্টিনে। এসব শিশু এখন খাবার, আবাসিক ব্যবস্থাসহ নানা ধরনের সমস্যায় পড়েছে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ আবার কোয়ারেন্টিনের অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।

বুড়িমারী ডাকবাংলোতে কোয়ারেন্টিনে আছে ভারত থেকে আসা তিন শিক্ষার্থী। দুজনের মা ঢাকা থেকে  নিতে এসে নিজেরাও আটকে আছেন এক ধরনের ‘স্বেচ্ছা কোয়ারেন্টিনে’। এসব শিশু ও অভিভাবকরা পড়েছেন নানা দুর্ভোগে। আবার ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে এসব শিশু-কিশোর মানসিকভাবে আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। তাদেরই একজন শিলিগুড়িতে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া রিদওয়ান জামান তানভীর। ঢাকায় থাকা মা-বাবা তাকে নিতে আসেননি। ফলে বুড়িমারীতে তাঁদের ছাড়াই অন্য শিশুদের সঙ্গে কষ্টে কোয়ারেন্টিনে আছে সে।’

চট্টগ্রাম থেকে নানা কাঠখড় পুড়িয়ে মাইক্রোবাসে বুড়িমারীতে সন্তানকে নিতে এসেছিলেন আজিম উদ্দিন চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘এখানে এসে শুনলাম শিশুদেরও ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে থাকতে হবে। এখন সন্তানকে একা রেখে আমরা বাড়িতে ঈদ করতে পারি না। তাই আমাকেও এক ধরনের কোয়ারেন্টিনেই থাকতে হচ্ছে।’

আটকে থাকা শিশু-কিশোরদের কোয়ারেন্টিনের সময়সীমা কমানো হবে কি না তা এখনো সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে জানানো হয়নি বলে জানান পাটগ্রাম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাইফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এখনো যেহেতু কোনো নির্দেশনা আসেনি সেহেতু শিশুদেরও আপাতত বিধি-নিষিধের মধ্যেই থাকতে হবে।’



সাতদিনের সেরা