kalerkantho

সোমবার । ৭ আষাঢ় ১৪২৮। ২১ জুন ২০২১। ৯ জিলকদ ১৪৪২

ছিনতাইয়ের ‘অভয়ারণ্য’ কুড়িল ফ্লাইওভার

♦ বাধা দেওয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও ঘটছে
♦ ল্যাম্পপোস্টে লাইট নেই; নেই সিসিটিভি

মোবারক আজাদ   

১১ মে, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



ছিনতাইয়ের ‘অভয়ারণ্য’ কুড়িল ফ্লাইওভার

রাজধানীর কুড়িল ফ্লাইওভার আশপাশের এলাকার যানজট দূর করে গাড়িগুলোকে এনে দিয়েছে স্বাভাবিক গতি। তবে এখানে ‘গতি রোধ’ করার ঘটনাও কম ঘটছে না। রাত হলেই মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার থামিয়ে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে দুর্বৃত্তরা। এমনকি হত্যার ঘটনাও বিরল নয়। সব মিলিয়ে অপরাধের ‘অভয়ারণ্যে’ পরিণত হয়েছে ফ্লাইওভার ও এর নিচের পুরো এলাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১৩ সালে বহুল প্রত্যাশিত ফ্লাইওভারটি উদ্বোধনের কয়েক মাস পর থেকেই এর নিচে রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের লাইট নষ্ট হতে থাকে। এরপর আর সেগুলো সেভাবে মেরামত করা হয়নি। নেই সিসিটিভি। এসবের সুযোগে মাদকসেবী, কারবারি ও ছিনতাইকারীরা ফ্লাইওভারের নিচসহ আশপাশের এলাকায় আখড়া গড়ে তুলেছে।

গত বৃহস্পতিবার ভোরে কুড়িল ফ্লাইওভার থেকে গলায় গামছা প্যাঁচানো অবস্থায় সুভাষ চন্দ্র সূত্রধর (৩৬) নামের এক দুবাইপ্রবাসীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পুলিশের ধারণা, ছিনতাইয়ে বাধা দেওয়ায় এ হত্যাকাণ্ড।

এর আগে গত ৩ জানুয়ারি মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করা হয়। গত বছরের ১০ ডিসেম্বর ভোর ৩টায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির (৪০) লাশ উদ্ধার করে টহল পুলিশ। এ ছাড়া ২০১৭ সালে এ এলাকায় এক তরুণীর মরদেহ ফেলে যায় দুর্বৃত্তরা। প্রতিটি ঘটনা প্রায় একই ধরনের। ভুক্তভোগীদের মুখে-গলায় গামছা প্যাঁছানো ছিল এবং শরীরে ছিল আঘাতের চিহ্ন। এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনেও ছিনতাই বলে ধারণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের। এ ছাড়া আলোর স্বল্পতা ও বেপরোয়ার গতির কারণে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। এমনও হয়েছে যে এক রাতেই তিনটি দুর্ঘটনা ঘটেছে এই ফ্লাইওভারে।

৩০৬ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ৩.১ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের ফ্লাইওভারটি বনানী, কুড়িল, খিলক্ষেত, প্রগতি সরণি ও পূর্বাচলের সড়কগুলোয় যুক্ত হয়েছে। এর এক পাশে খিলক্ষেত থানা, অন্য পাশে ভাটারা থানা। থানা দুটির কাছে ফ্লাইওভারকেন্দ্রিক অপরাধের সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে ফ্লাইওভারের আশপাশের দোকানিরা জানান, প্রায়ই এখানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। গাড়িতে তোলার পর যাত্রীদের সব ছিনিয়ে নিয়ে পরে নামিয়ে দেওয়া হয়। যাত্রীরা বেশির ভাগ ভ্রাম্যমাণ হওয়ায় তারা থানায় অভিযোগ দেয় না।

জানা যায়, রাত হলেই মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও প্রাইভেট কার টার্গেট করে ছিনতাইকারী। লুটে নেয় টাকা-পয়সা, মোবাইল ফোনসহ মূল্যবান জিনিসপত্র। মোটরসাইকেল ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। অন্ধকার ফ্লাইওভারে সুযোগ বুঝে নাইলনের সুতা বা তার দুই পাশে ধরে রাখে অপরাধীচক্রের সদস্যরা। মোটরসাইকেল আরোহীরা যাওয়ার সময় সুতা গলায় বেঁধে পড়ে যায়। তখন তাঁর কাছে থাকা টাকা-পয়সা ও মালপত্র লুটে নিয়ে চম্পট দেয় দুর্বৃত্তরা। 

পুলিশের ধারণা, কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র এসব ঘটনা ঘটাচ্ছে। এই চক্রে অনেক সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ও ট্রাকের চালকও জড়িত। তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

পুলিশ অবশ্য কিছু দিন আগে অপরিচিত কোনো ব্যক্তির প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস ইত্যাদিতে না ওঠার পরামর্শ দিয়ে ফ্লাইওভার এলাকায় একাধিক সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দিয়েছে।

খিলক্ষেত থানার ওসি মীর ছাব্বীর আহাম্মেদ বলেন, ‘আমরা অপরাধ নির্মূলে কাজ করে যাচ্ছি। ল্যাম্পপোস্টের লাইট নষ্টের বিষয়টি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) জানানো হয়েছে। এ ছাড়া রাস্তার কিছু উন্নয়নমূলক কাজ চলমান থাকায় রাস্তায় সিসিটিভি নেই।’

অবশ্য রাজউক বলছে, দেখাশোনার জন্য ফ্লাইওভারটি সড়ক ও জনপথ বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। আর সড়ক ও জনপথ বিভাগের জনসংযোগ দপ্তর সূত্র জানায়, তারা এখনো এটি বুঝে পায়নি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার ইফতেখায়রুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত টহল দেওয়া হয়। এর পরও দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা যে ঘটে না, তা নয়। তিনি বলেন, ‘এমনও হয়েছে, যেসব অপরাধীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছিল, আবার তারা বের হয়ে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এ জন্য আমরা কারাগারের সঙ্গে যোগাযোগ রাখি। কেউ বের হলে তাকে চাপে ও নজরে রাখা হয়, যাতে একই কাজে তারা আর না জড়ায়।’