kalerkantho

শনিবার । ৫ আষাঢ় ১৪২৮। ১৯ জুন ২০২১। ৭ জিলকদ ১৪৪২

ত্রাণ নেওয়ার আছে দেওয়ার মানুষ নেই

জহিরুল ইসলাম   

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



রাজধানীর নীলক্ষেত মোড়ে বসে ছিলেন ১০-১২ জন বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষ। কাছে এগিয়ে গিয়ে একজনের কাছে জানতে চাইলে তিনি নিউ মার্কেটের একটি কাপড়ের দোকানের সেলসম্যান লোকমান মজুমদার পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘মার্কেট বন্ধ হইয়া আছে। মালিক শেষ মাসের (মার্চ) টাকাটাও দেয় নাই। দুই মাইয়া নিয়া খুব বেকায়দায় পইড়া গেছি। আট হাজার টাকা বেতন পাইতাম। বাসা ভাড়াই চার হাজার টাকা। এখন চাউল কেনার টাকাও নাই। গত বছর মানুষ কিছু সাহায্য করছিল। এই জন্য রাস্তায় বইসা আছি।’

লোকমানের মতো স্বল্প আয়ের বহু মানুষ কাজ হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে ত্রাণের আশায় তারা রাজধানীর বিভিন্ন রাস্তার মোড়ে, সিগন্যালে ভিড় করছে। গত রবিবার থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত রাজধানীর লালবাগ, আজিমপুর, সদরঘাট, হাতিরঝিলসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বহু সাহায্যপ্রার্থীর দেখা মেলে।

এরই মধ্যে এক সপ্তাহের কঠোর বিধি-নিষেধ (লকডাউন) আরো এক সপ্তাহ বাড়িয়েছে সরকার। তবে দিনে দিনে রাস্তায় রিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ প্রাইভেট কারের সংখ্যা বাড়ছে। এতে দিন এনে দিন খাওয়া কিছু মানুষের কোনো রকমে দিন পার করার উপায় হচ্ছে। তবে লোকমানদের মতো কাজ না থাকা শত শত মানুষকে ত্রাণের আশায় হাত পাততে হচ্ছে। লকডাউনের সময় যত গড়াচ্ছে তাদের সংখ্যাও বাড়ছে।

গত বছর করোনার প্রথম প্রবাহের সময় সাধারণ ছুটিতে কঠিন সময় পার করেছে স্বল্প আয়ের মানুষ। তবে শুরু থেকে তাদের পাশে ছিল সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংগঠন থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লাকেন্দ্রিক ক্লাব, ফাউন্ডেশন ও পরিবার। ব্যক্তি পর্যায়েও অনেকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এবার সরকারি উদ্যোগ ছাড়া ব্যক্তি বা সংগঠনের ব্যানারে ত্রাণ কার্যক্রম সেভাবে নজরে আসছে না।

সোমবার আজিমপুর কবরস্থানের পাশে বেশ কয়েকজন নারী ত্রাণের জন্য বসে ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছালেহা বেগম নামের এক গৃহকর্মী বললেন, ‘ইরাকি মাঠে এক সাবের বাসায় কাম করতাম। লকডাউন দেওনে এহন যাইতে মানা করছে। তিনডা কাম করতাম। এহন একটাও নাই।’ আজিমপুর এতিমখানার সামনে খালেদা আক্তার নামে আরেক নারী বলেন, ‘ভাই, কাম-কাইজ নাই! আইজকাই প্রথম এই জায়গায় আইসা বইছি। দেহি, কিছু পাই নাকি।’

গুলিস্তান ফুলবাড়িয়ায় বাসে বাসে পানি বিক্রি করতেন ইমাম হোসেন। গাড়ি বন্ধ থাকায় তাঁর রোজগার বন্ধ হয়ে গেছে। তাই মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে গত বুধবার সাহায্য চাইছিলেন তিনি। ইমাম বলেন, ‘খুব কষ্টে আছি! প্রতিদিন পানি বিক্রি কইরা যা আয় হইতো, সেইটা দিয়া নিজে চলতাম। আবার অসুস্থ মায়ের জন্যে গ্রামেও টাকা পাঠাইতাম। এখন সব বন্ধ। মসজিদের সামনে মাইনসে নরম মনে দান করে। এই জন্যে দাঁড়াইয়া আছি। কিন্তু এইহানেও তো মানুষ কম!’

লালবাগ শহীদনগর বউবাজারে দেখা হলো জুলেখার সঙ্গে। তিনি বিভিন্ন দোকান থেকে সাহায্য হিসেবে টাকা না নিয়ে মাছ, সবজি, চাল-ডাল নিচ্ছিলেন। জুলেখা বলেন, ‘বাবারে, টাকা নিয়া কী হইবো। এক কেজি চাইলও (চাল) কিনতাম পারি না। এহন মাইনসের কাছ থেইক্কা যা যা কিনন লাগে হেইডাই হাত পাইত্তা নেই।’



সাতদিনের সেরা