kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

ভেজাল ইফতারিতে সয়লাব বাজার

সজীব আহমেদ   

২৩ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



একদিকে করোনা মহামারি, অন্যদিকে লকডাউন। এর মধ্যেই এবার এসেছে রোজা। রোজায় অপরিহার্য পণ্য ইফতারসামগ্রী। অসাধু ব্যবসায়ীরা ইফতারসামগ্রীতে যাতে ভেজাল মেশাতে না পারেন সে জন্য প্রতিবছর ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। এবার পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে লকডাউন পক্রিয়ায় ব্যস্ত থাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত এদিকটায় তেমন নজর দিতে পারছেন না। ফলে আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন অসাধু ব্যবসায়ীরা।   

ইফতারসামগ্রী আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হয় বিভিন্ন ধরনের কেমিক্যাল রং। প্রায় প্রকাশ্যে ফুটপাতসহ বিভিন্ন খাবারের দোকানে ময়দার সঙ্গে কেমিক্যাল রং মিশিয়ে, পোড়া তেলে ভেজে তৈরি করা হচ্ছে ইফতারি। বাসি ইফতারি মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন তৈরি করা ইফতারির সঙ্গে। এসব সামগ্রী দেদার বিক্রিও হচ্ছে।

রাজধানীর দক্ষিণ কুড়িলে মায়ের দোয়া নামে একটি খাবার দোকানে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, প্রকাশ্যে ইফতারি তৈরির ময়দার সঙ্গে মেশানো হচ্ছে রং। দৃষ্টি আকর্ষণ করলে দোকানের কর্মী আবুল খায়ের প্রথমে অস্বীকার করেন। পরে স্বীকার করে বলেন, ‘তেলে ভাজা ইফতারসামগ্রীর সৌন্দর্য বাড়াতে আমরা অল্প রং ব্যবহার করি। এই রং মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকর, এটা জানি না। আমরা একা না, সব খাবার দোকানেই ইফতারিতে রং মেশায়। রং না মিশিয়ে শুধু বেসন দিয়ে তৈরি করলে এসব খাবার দেখতে আকর্ষণীয় হয় না। ক্রেতারাও কিনতে আগ্রহ দেখান না।’

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রেস্টুরেন্টগুলোর পাশাপাশি মৌসুমি ব্যবসায়ীরা রাস্তার মোড়ে, অলিগলিতে ইফতারির পসরা সাজিয়ে বিক্রি করছেন। ছোলা, বেগুনি, পেঁয়াজু, ডালের বড়া, নিমকি, বুন্দিয়া, আলুর চপ থেকে শুরু করে মুরগির সুতি কাবাব, শাহি জিলাপি, হালিম, লাচ্ছি, দইসহ বহু রকমের ইফতারি বিক্রি হচ্ছে। এসব ইফতারির প্রায় সবই ভেজাল।

অবিক্রীত ইফতারি কী করা হয় জানতে চাইলে বিক্রেতারা জানান, ইফতারির কিছু আইটেম আছে বিক্রি না হলে ফেলে দিতে হয়। আবার কিছু আইটেম রয়েছে যেগুলো তেলে ভেজে রেখে পরের দিন বিক্রি করা হয়। তবে ব্যবসায়ীরা কখনো নষ্ট খাবার বিক্রি করেন না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে—বেগুনি, পেঁয়াজু, ডালের বড়া, নিমকি, আলুর চপসহ অনেক ধরনের ইফতারসামগ্রী আকর্ষণীয় করতে ব্যবহৃত হচ্ছে কেমিক্যাল রং। জিলাপি দীর্ঘ সময় মচমচে রাখতে ব্যবহার করা হচ্ছে পোড়া মবিল। মুড়ি সাদা করতে ব্যবহার হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইড। বুন্দিয়া, জিলাপিসহ মিষ্টান্নজাতীয় খাবার তৈরিতে ব্যবহার হচ্ছে ভেজাল চিনি। এর রাসায়নিক নাম সোডিয়াম সাইক্লামেট। খাবারকে অধিকতর মিষ্টি করতে ব্যবহৃত হচ্ছে স্যাকারিন, সুকরালেস ইত্যাদি।

ইফতারিসহ সব খাদ্যপণ্য ভেজালমুক্ত ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার দাবিতে সম্প্রতি পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) ও বারসিকের এক আলোচনায় বক্তারা বলেন, ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত লাভের আশায় ইফতারিতে ভেজাল মেশায়। খাদ্যে ভেজাল এমন একটি নীরব ঘাতক, যা ধীরে ধীরে সুস্থ মানুষকে অসুস্থ করে তোলে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে।’

বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আব্দুল কাইউম সরকার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘হোটেল-রেস্তোরাঁয় যেসব কর্মচারী আছে আমরা তাদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি কিভাবে সতর্কতার সঙ্গে ইফতারি তৈরি করতে হবে। আমরা বিভিন্ন পত্রিকা, লিফলেট ও হ্যান্ডবিলের মাধ্যমে প্রচারণাও চালিয়েছি। তার পরও কিছু ব্যবসায়ী ইফতারিতে ভেজাল মিশিয়ে বিক্রি করছে। লকডাউন পরিস্থিতিতে আমাদের মুভমেন্টে সীমাবদ্ধতা আছে। তার পরও স্পেসিফিক কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে বিষয়টি দেখব।’ 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের চেয়ারম্যান ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কেমিক্যাল রং, পোড়া তেল ও মবিল মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। ইফতারি পণ্য আকর্ষণীয় করতে এগুলো ব্যবহার করলে পেটের পীড়া থেকে শুরু করে ক্যানসার, লিভার ও কিডনি ফেইলিওর হতে পারে। বাইরে বিক্রি হওয়া আকর্ষণীয় ইফতারসামগ্রী খাওয়া থেকে বিরত থাকাই শ্রেয়। পুলিশ প্রশাসন ও ভ্রাম্যমাণ আদালত এখন লকডাউন বাস্তবায়নে ব্যস্ত। তার পরও খাদ্যপণ্যে কিছু নজরদারি করা প্রয়োজন। এ বছর তেমনভাবে নজরদারি না থাকায় অসাধু ব্যবসায়ীরা সুযোগ নিচ্ছেন।’