kalerkantho

শুক্রবার । ১১ আষাঢ় ১৪২৮। ২৫ জুন ২০২১। ১৩ জিলকদ ১৪৪২

বিশ্ব ধরিত্রী দিবস আজ

জলবায়ু বদলের বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

শরীফুল আলম সুমন   

২২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বিশ্বে বিভিন্ন দেশ এখন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জর্জরিত। ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাসসহ নানা দুর্যোগের ঝুঁকির মাত্রা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিসহ নানামাত্রিক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বাংলাদেশও জলবায়ু বদলের চরম ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। এ ছাড়া বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি, দূষণ, বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, নদী ভরাট করে ফেলা, জলাভূমি কমে যাওয়ার মতো কারণে এই ঝুঁকি দিন দিন তীব্র হচ্ছে।

এমন বাস্তবতায় আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে বিশ্ব ধরিত্রী দিবস-২০২১। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘আমাদের পৃথিবী পুনরুদ্ধার করুন’। এ বছর এমন সময়ে ধরিত্রী দিবস পালন হচ্ছে, যখন পুরো পৃথিবী কভিড-১৯ ভাইরাস সংক্রমণে বিপর্যস্ত। ফলে বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই দিবসটি এবার আনুষ্ঠানিকভাবে পালিত হচ্ছে না।

১৯৬৯ সালে সানফ্রানসিস্কোতে ইউনেসকো সম্মেলনে শান্তিকর্মী জন ম্যাককনেল পৃথিবী মায়ের সম্মানে একটি দিন উৎসর্গ করার প্রস্তাব দেন। তবে সর্বপ্রথম ১৯৭০ সালে মার্কিন সিনেটর গেলর্ড নেলসন ধরিত্রী দিবসের প্রচলন করেন। পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার মাধ্যমে ধরিত্রীকে টিকিয়ে রাখাই এ দিবসের লক্ষ্য।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের প্রধান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের ভূমিকা নগণ্য। কিন্তু উপকূলীয় রাষ্ট্র হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের দেশ। বৈশ্বিক তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস বেড়ে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এক মিটার বাড়বে। ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষজন নগরাঞ্চলে মাইগ্রেশন হবে। পানিতে লবণাক্ততা বাড়ার ফলে কৃষি জমিও কমবে। আমাদের যে সক্ষমতা আছে তাতে উদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে না। ফলে চরম সমস্যার মুখোমুখি উপনীত হব আমরা।’

ইন্টারন্যাশনাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) পঞ্চম প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৫০ সালনাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বাংলাদেশে প্রায় দুই কোটি ৭০ লাখ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত ক্লাইমেট ভালনারেবল মনিটর অনুসারে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে ২০৩০ সালনাগাদ বাংলাদেশে প্রতিবছর অতিরিক্ত ছয় লাখ মানুষ ঝুঁকিতে রয়েছে এবং ১২৫ কোটি ডলারের অতিরিক্ত অর্থনৈতিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।

মৃত্তিকাসম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের এক গবেষণা অনুযায়ী, ১৯৭৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত মাটিতে লবণাক্ততা বেড়েছে ২ শতাংশ। এ কারণে চাল ও গম উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

সেন্টার ফর রিসার্চ অন দি এপিডেমিওলজি অব ডিজাস্টারসের (সিআরইডি) তথ্যমতে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ৫৫টি বন্যা ও ৭২টি ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়েছে। এটা ১৯৭০-৯০ সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিবিএসের তথ্যমতে, ২০০৯-১৫ সময়ে বন্যায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় তিন হাজার ৭০ কোটি ৮০ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ ২০১৫-এর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০০৯-১৪ সময়ে ঘূর্ণিঝড় ও টর্নেডোতে বাংলাদেশের মোট খানার ২৫.৫১ শতাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বাংলাদেশে বিগত ২৫ বছরে ঘূর্ণিঝড় সংঘটনের হারের ক্রমবৃদ্ধি লক্ষণীয়। ১৬ বছরে (১৯৯১-২০০৬) ছয়টি ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানলেও গত এক দশকে (২০০৭-২০২০) সিডর, আইলা, মহাসেন, কোমেন, রোয়ান, বুলবুল, আম্ফানসহ ১৩টি ঘূর্ণিঝড় সংঘটিত হয়। ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশে এ ঘূর্ণিঝড়গুলোর আঘাত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বাস্তবতারই প্রতিফলন।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. আবদুল মতিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ধরিত্রী দিবস বাংলাদেশের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই মুহূর্তে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ধাক্কা আমাদের বড় উদ্বেগের কারণ। এই জলবায়ু পরিবর্তন কমাতে না পারলে উপকূলীয় দেশগুলো চরম ক্ষতির মুখে পড়বে। তাই বিশ্বকে জলবায়ু পরিবর্তন রোধে উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি নিজস্ব সম্পদের সংরক্ষণ ও এর সদ্ব্যবহার করতে হবে।’