kalerkantho

সোমবার । ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৭ মে ২০২১। ০৪ শাওয়াল ১৪৪

ফেরিঘাটে লাশের গাড়ির ভিড়

ফ্রিজার ভ্যানে লাশের ৯০ শতাংশই করোনায় আক্রান্ত

সজিব ঘোষ   

২০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



প্রায় প্রতিদিনই নতুন করে ইতিহাস গড়ছে করোনায় আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা। এই লাশের মিছিলে স্বজনের কান্নার সঙ্গে বাড়ছে অ্যাম্বুল্যান্সের গতিও। লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যান ছুটে চলছে ঢাকা থেকে দূরদূরান্তে। ‘লকডাউন’ চলায় আরিচা-কাজির হাট এবং পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌপথে বন্ধ রাখা হয়েছে ফেরি চলাচল। তবে রাতে পণ্যবাহী যান নিয়ে চলে ফেরি। আর দিনেরবেলা কিছু কিছু ফেরি বিশেষ প্রয়োজনে ছেড়ে যায় ঘাট।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, কয়েক দিনে পাটুরিয়া ফেরিঘাটে লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের চাপ বেড়েছে। প্রতিদিনই গড়ে কমপক্ষে ২০টি লাশের গাড়ি ফেরি পার হচ্ছে। আর এসব মৃত ব্যক্তির ৯০ শতাংশই করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে।

ফেরিঘাটসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, এত লাশের গাড়ি গত বছর করোনায়ও দেখা যায়নি। এবার মানুষের ভয় কিছুটা কমেছে, তাই করোনায় মৃত ব্যক্তিদেরও সঠিকভাবে দাফন করা হচ্ছে। এতে যাদের বাড়ি নদীর ওই পাড়ে তাদের নিজ এলাকায় কবর দিতে নিয়ে যাওয়ার কারণেই ফেরিঘাটে এত লাশের গাড়ি দেখা যায়।

মানিকগঞ্জের শিবালয় থানার ওসি মো. ফিরোজ কবির বলেন, ‘দিনে ফেরি চলাচল বন্ধ থাকে। তবে অ্যাম্বুল্যান্স ও ভিআইপিদের গাড়ি পারাপারের জন্য তিনটি ফেরি চালানো হয়। কয়েক দিন ধরে লাশবাহী গাড়ি পার করার জন্যই দিনের বেলায় ফেরি বেশি চালানো হচ্ছে। প্রতিদিনই ২০-২৫টি করে লাশবাহী গাড়ি পার হচ্ছে। এমনটা আমি আগে কখনো দেখিনি।’

এদিকে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে এখন ফ্রিজার ভ্যানের চাহিদা বেড়েছে কয়েক শ গুণ। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে অ্যাম্বুল্যান্সের দালাল চক্র। কোথাও এখন পর্যন্ত অ্যাম্বুল্যান্সের সংকটের কথা শোনা যায়নি। এমনকি ঢাকার প্রায় সব কয়টি হাসপাতালের বাইরে অ্যাম্বুল্যান্সকে হাতের লাগালেই দেখা যায়। তবু কেন বেশি ভাড়া—এমন প্রশ্নের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অ্যাম্বুল্যান্স মালিক সমিতির এক সদস্য বলেন, ‘হাসপাতালের দালাল চক্রের কারণেই এমনটা হচ্ছে। তারা বাইরে থেকে হাসপাতালের ভেতর অ্যাম্বুল্যান্স ঢুকতে দেয় না। তাদের মাধ্যমেই মৃত ব্যক্তির স্বজনদের অ্যাম্বুল্যান্স ভাড়া করতে হয়। প্রতি ভাড়া থেকে তাদের ২০ শতাংশ দিতে হয়। দালালদের টাকা না দিতে হলে ভাড়াও একটু কম রাখা যেত। আর বেসরকারি হাসপাতালগুলো তো শুধু আমাদের নম্বর দিয়ে দেয়, এতেই মাস শেষে মোট ভাড়ার ২০ শতাংশ টাকা তাদের দিতে হয়।’

আবার দম ফেলার ফুরসত নেই অ্যাম্বুল্যান্স চালকদের। তাদের প্রায় সবাই অ্যাম্বুল্যান্সের মালিকের কাছ থেকে ট্রিপভিত্তিক টাকা পান। এমন একজন রাজু মিয়া বলেন, ‘আমাদের গাড়ি চালাইতেই হয়, এটাই পেশা। করোনার লাশ টানি এতে প্রথম দিকে ভয় লাগলেও এখন ঠিক হয়ে গেছে। সংসার চালাইতে হবে এটা ঠিক, আবার মানবতারও একটা বিষয় আছে। আমরা কাজ না করলে কেমনে হবে। ঝামেলায় পড়তে হয় ফেরি দিয়ে ফেরার পথে। খালি গাড়ি নিয়ে তখন আর ফেরিতে পার হতে পারি না। অনেক দূর ঘুরে যমুনা সেতু দিয়ে আসতে হয়।’

ঢাকা মহানগর অ্যাম্বুল্যান্স মালিক সমবায় সমিতির সভাপতি মো. আলমগীর হোসেন বলেন, ‘অ্যাম্বুল্যান্সের চাপ কিছুটা বাড়ছে, তবে বেশি বাড়ছে লাশবাহী ফ্রিজার ভ্যানের চাপ। যেখানে আগে আমরা দিনে গড়ে সাত-আটটা ফ্রিজার গাড়ি পাঠাইতাম। এখন এমনও দিন যায় ৮০, ৯০, ১০০টা গাড়ি পাঠাই। ঢাকার ভেতর এক গাড়ি দিনে দুই তিনটা ট্রিপও মারে। এর ৯০ শতাংশই করোনা রোগীর লাশ।’

অ্যাম্বুল্যান্সের অতিরিক্ত ভাড়া ও চালকদের সুরক্ষার ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমি সবাইকে বলব ৯৯৯, ৩৩৩, ১৬২৬৩ এসব নম্বরে কল দিয়ে অ্যাম্বুল্যান্সের সেবা নেওয়ার জন্য, তাতে করে দালালের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হবে না। আমাদের এখন খরচ কিছুটা বাড়লেও ভাড়া বাড়ানোর দরকার পড়ছে না। বেশি ট্রিপে অতিরিক্ত খরচ পুষিয়ে যাচ্ছে। আর আমরা চালকদের করোনার মধ্যে কিভাবে গাড়ি চালাতে হবে তা পুরোপুরি প্রশিক্ষণ দিতে পারিনি। সরকারের দিক থেকে তাদের জন্য সুরক্ষাসামগ্রীও পাচ্ছি না।’