kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

পরিবহন শ্রমিকদের পাশে কেউ নেই

সজিব ঘোষ   

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



১২ দিন হলো মহসিন মিয়ার কাজ নেই। একমাত্র উপার্জনকারী মহসিনের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে পরিবারের সবাই। তাঁর ছোট্ট মেয়ে সুলতানা ভাবনায় আঁকে, আজ বুঝি বাবা চকোলেট এনেই দেবেন। সহধর্মিণী ইশারায় বোঝান, কাল বাজারে যেতেই হবে। সব বুঝেও চুপ মহসিন। এই ১২ দিনে তাঁর জমানো কিছু টাকা যে ফুরিয়ে এসেছে। এমন চুপ করে থাকা মহসিনের সংখ্যাটা নেহাত কম নয়।

করোনা, সাধারণ ছুটি, নিষেধাজ্ঞা, লকডাউন, কঠোর লকডাউন—এসব শব্দের সঙ্গে পরিচিত হতে গিয়ে জীবিকায় টান পড়েছে মহসিনের মতো আরো অনেক পরিবহন শ্রমিকের। সেই টান এখন ঠেকেছে পেটে। সড়কে পণ্যবাহী পরিবহন ও ব্যক্তিগত পরিবহন কমবেশি চললেও অনুমতি নেই গণপরিবহন চলার। তাই রুজি বন্ধ হওয়ায় কষ্টে আছেন পরিবহন শ্রমিকরা। কষ্টের কথা মুখ ফুটে প্রকাশ্যে বলতেও পারছেন না তাঁরা। কেননা, কষ্টের কথা বলতে গেলে বদনাম হবে শ্রমিক মালিক নেতাদের। তাতে পরে আর চালানোর জন্য গাড়িই মিলবে না।

করোনা সংক্রমণ রোধে সরকারের নির্দেশে গত ৪ এপ্রিল থেকে সারা দেশের আন্ত জেলা পরিবহন বন্ধ। এর দুই দিন পর সিটি করপোরেশন এলাকায় বাস চললেও এক সাপ্তাহ পর ‘কঠোর লকডাউনে’ তা-ও বন্ধ হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে বেশির ভাগ শ্রমিকই এখন বেকার। কিছু শ্রমিক পরিবহন রক্ষণাবেক্ষণ ও পাহারার কাজ করছেন। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনালসহ দেশের অন্য টার্মিনালগুলোতে গাড়ির নিরাপত্তার জন্য হেল্পার কিংবা কন্ডাক্টরকে কাজে লাগিয়েছেন বাস মালিকরা। এতে তাঁরা যে টাকা পাচ্ছেন তা দিয়ে কোনো রকমে নিজের খরচ চালানো সম্ভব হলেও পরিবারকে টাকা পাঠাতে পারছেন না।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রামপুরা থেকে বাড্ডা, ফুলবাড়িয়া, কমলাপুর, আজিমপুর, মিরপুর, সায়েদাবাদ টার্মিনালের বাইরে এবং কুড়িল ফ্লাইওভারের নিচে সারিবদ্ধ শত শত বাস রেখে দেওয়া হয়েছে।

রহমান মিয়া প্রভাবশালী এক পরিবহন নেতার মালিকানাধীন কম্পানির বাস চালান। তিনি বলেন, ‘কার কথা কমু, কন। মালিকরা আমাগো কথা কী কইবো, তারা আছে নিজেগো ধান্দায়। প্রতিদিন যে এতগুলো কইরা টাকা চান্দা দিলাম তা এহন গেলো কই? কইছিল তো আমাগো জন্যই সব। এগোরে কিছু কইতে গেলে পরে আবার চালাইবার গাড়ি পামু না।’

ঢাকা-মাওয়া রুটের বাসচালক এনায়েত বলেন, ‘আমাদের দিন এনে দিন খেতে হয়। কাজ বন্ধ থাকলে জমানো টাকায় কয় দিন চলা যায়, কন। গত বছর তাও কোনো রকম কাটছে, এবার আর কাটবে বলে মনে হচ্ছে না। পরিবার নিয়ে দিনগুলা কষ্টে যাচ্ছে।’

পরিবহন বিশেষজ্ঞ হাদিউজ্জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ৪৭ লাখ। এসব যানের সঙ্গে প্রায় ৭০ লাখ শ্রমিক সরাসরি যুক্ত। পণ্যবাহী, ব্যক্তিগত—সব মিলিয়ে ২-৩ শতাংশ গাড়ি হয়তো এখন রাস্তায় চলছে। বাকি শ্রমিকদের খোঁজ কে নেবে? এই যে মালিক শ্রমিক সমিতি সংগঠগুলো রয়েছে, এদের এখনই সময় সাধারণ শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ানোর। নয়তো এই সংগঠনের দরকার কী? সরকারেরও উচিত হবে ফর্মাল সেক্টরের বাইরে ইনফর্মাল সেক্টরকেও প্রণোদনা ও ঋণ সহায়তা দেওয়া।’

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘আমরা শ্রমিকদের পাশে আছি। আপাতত গাড়ি চালানো নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের কোনো কথা হয়নি। আগে বাঁচতে তো হবে। আমরা আমাদের শ্রমিকদের ত্রাণ সহায়তা দেওয়া শুরু করেছি। আগামীকাল (রবিবার) মহাখালী বাস টার্মিনালে এক হাজার ২০০ শ্রমিককে ১০ দিনের শুকনা খাবার দেওয়া হবে। লকডাউন আরো দীর্ঘ হলে ত্রাণ কার্যক্রমও বাড়ানো হবে।’ 

বাংলাদেশ ট্রাক কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হোসেন মো. মজুমদার বলেন, ‘দেশে সব মিলিয়ে পণ্য পরিবহনের গাড়ি আছে তিন লাখ ৫৭ হাজার ৮৮৭টি। বর্তমানে এর অর্ধেক গাড়ি বসে আছে। অর্থাৎ অর্ধেক শ্রমিকও বেকার। আমাদের সমিতির পক্ষ থেকে সবাইকে নিয়মিত সাহায্য করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকার যে ত্রাণ দেয়, তা শ্রমিক পর্যন্ত ঠিকভাবে পৌঁছায় না। পণ্য পরিবহনের শ্রমিকদের প্রণোদনা দেওয়ার জন্য আমি প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠিও দিয়েছি।’



সাতদিনের সেরা