kalerkantho

রবিবার । ৬ আষাঢ় ১৪২৮। ২০ জুন ২০২১। ৮ জিলকদ ১৪৪২

ঘর ছেড়ে হাওরে ব্যস্ত নারীরাও

ধান কাটা

শামস শামীম, সুনামগঞ্জ   

১৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



হাওর অঞ্চলে প্রবাদ রয়েছে, ‘যদি না থাকে ধান কাম/ তে না করে অন্য কাম।’ অর্থাৎ এই সময়ে ধান কাটা ছেড়ে অন্য কাজে যেতে নেই। ধান কাটার কাজ না থাকলে অন্য কাজ করা যেতে পারে। কৃষি অর্থনীতির চাকা সচল রাখা কৃষকরা এখন ব্যস্ত হাওরে। বজ পাত, কালবৈশাখী ঝড়, শিলার আশঙ্কায় অস্থির কৃষকরা। তাই কষ্টের ধান গোলায় তুলতে উদগ্রীব তাঁরা। পর্যাপ্ত শ্রমিক না পেয়ে স্ত্রী, ছেলে-মেয়েদের নিয়েই ক্ষেতে নেমেছেন তাঁরা। চাষি ও শ্রমিকদের সঙ্গে নারী ও শিশু-কিশোররা হাওরে কাজ করছে। সুনামগঞ্জ জেলার সব হাওরে ধান কাটা শুরু হওয়ায় এই চিত্রই দেখা যাচ্ছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশব্যাপী চলছে কঠোর লকডাউন। তবে বোরো ভাণ্ডার খ্যাত হাওর অঞ্চলের কৃষকের কথা বিবেচনা করে সেখানকার বোরো চাষি ও শ্রমিকদের জন্য লকডাউন শিথিল করেছে সরকার।

গত শুক্রবার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার দেখার হাওর ঘুরে দেখা যায়, হাওরে ব্যস্ত কৃষক ও শ্রমিকরা। হাওরের ধানখলায় ব্যস্ত নারী ও শিশুরা। দুপুরে সদর উপজেলার ঝাউয়ার হাওরে হাছনবসত এবং কালিপুর গ্রামের কয়েকজন নারী কাজ করছিলেন। কেউ ক্ষেত থেকে ধানের মুঠো টানছেন, কেউ চিটা ছাড়াচ্ছেন, কেউ রোদে ছড়ানো ধান নাড়া দিচ্ছেন। তাঁদের সঙ্গ দিচ্ছে শিশু-কিশোররা। সত্তরোর্ধ্ব জুলেখা খাতুন তাঁর পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া নাতি ফয়সালকে নিয়ে খড় শুকাচ্ছেন। পাশেই খলায় তাঁর মেয়ে আনোয়ারা ধান শুকাচ্ছেন। এই খলার পাশে ষাটোর্ধ্ব শারজান বিবির ছেলে কয়েকজন শ্রমিক নিয়ে ধান কেটে খলায় এনে রেখেছেন। সেগুলো মাড়াই করে চিটা ছাড়িয়ে শুকাচ্ছেন শারজান ও তাঁর তিন মেয়ে। এর পাশে শ্রমিক সাহেরা বিবি (৫৫) ধানের বিনিময়ে হাওরে কাজ করতে এসেছেন। তিনি সারা দিন গৃহস্থঘরের নারীদের সঙ্গে কাজ করবেন। এভাবে বৈশাখ মাসব্যাপী কাজ করে তিনি কয়েক মাসের খোরাক সংগ্রহ করবেন বলে জানালেন।

এই নারীরা জানান, সচ্ছল ও গৃহস্থ পরিবারের নারীরা হাওরে নিজেদের কাজ করেন। আর দরিদ্র পরিবারের নারীরা মৌসুমি শ্রমিক হিসেবে ধানের বিনিময়ে হাওরে কাজ করেন। তাঁরা সঙ্গে ছেলে-মেয়েদেরও নিয়ে আসেন।

শারজান বিবি বলেন, ‘আমার ছেলে আড়াই একর জমি চাষ করেছে। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ জমির ধান পাকার পর কেটে ফেলেছে। তবে শ্রমিক মিলাতে কষ্ট হয়েছে ছেলের। শেষ পর্যন্ত শ্রমিকদের সঙ্গে ছেলেও ধান কাটতে শুরু করেছে। ছেলেকে সহযোগিতা করতে বাড়ি তালাবদ্ধ করে মেয়েদের নিয়ে হাওরে এসেছি। না এসে উপায় নেই। যেকোনো মুহূর্তে আবহাওয়া খারাপ হয়ে যায়। তাই কষ্টের ধান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে সব সময়। কিভাবে দ্রুত ধান কেটে গোলায় তোলা যায়, এই চিন্তায় অস্থির থাকি সবাই।’

বৃদ্ধা জুলেখা বেগম বলেন, ‘ছোটবেলায় দেখেছি আমাদের মা-চাচিরা বাবা ও ভাইদের সঙ্গে বৈশাখে হাওরে নামতেন। তাঁদের দেখাদেখি আমরাও হাওরে নামতে শুরু করি। বৈশাখে সারা দিন কোনো কৃষকের স্ত্রী-কন্যা বাড়িতে থাকে না। প্রয়োজনেই ধানখলায় আসতে হয় আমাদের। অনেকে রাতেও খলাঘরে থাকেন।’

দেখার হাওরের তাজপুর গ্রামের কিষানি জোবেদা খাতুন বলেন, ‘দেড় হাল (ছয় একর) জমিন করছি ইবার। ঘরবাড়ি তালা মাইরা আউরো আইয়া খাজ (কাজ) খরতাছি। আউর গেলে বাঁচবার উফায় নাই। তাই আমরা বাড়িত না বইয়া আউরো আইয়া খাজো নামছি।’

সাহেরা বিবি বলেন, ‘আমি গরিব মানুষ। পরতি বছর বৈশাখে মাইনষের ক্ষেতে আইয়া কাজ করি। সারা দিন কাজ কইরা কিছু ধান পাই। এই ধানে তিন-চাইর মাস ঘরো বইয়া খাইতাম পারি।’

সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী নেত্রী নিগার সুলতানা কেয়া বলেন, বৈশাখে হাওরে অন্য রকম চিত্র দেখা যায়। গ্রামের ধনী-গরিব কৃষক পরিবারের কোনো নারী বাড়িতে থাকেন না। পুরুষের সঙ্গে তাঁরাও সারা দিন হাওরের কান্দায় পড়ে থাকেন। ধান শুকানো ও পরিবহন, খড় শুকানোসহ নানা কাজ করেন। যুগ যুগ ধরেই হাওরের নারীরা এভাবে কৃষির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন।

সুনামগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. ফরিদুল হাসান বলেন, হাওরের জেলায় কাজ করতে না এলে জানা হতো না হাওরের ফসলের প্রতি সবাই কতটা দরদি। এই সময় প্রায় সব কৃষক পরিবারের নারীরা ঘর ছেড়ে সন্তান-সন্ততি নিয়ে হাওরে নামেন। কৃষিকাজ করেন। সবার একটাই লক্ষ্য, কিভাবে কষ্টের ধান গোলায় তোলা যায়।