kalerkantho

শনিবার । ৯ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৪ জুলাই ২০২১। ১৩ জিলহজ ১৪৪২

লাশ দাফন-সৎকারে আতঙ্ক কেটেছে

লায়েকুজ্জামান   

১৭ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



লাশ দাফন-সৎকারে আতঙ্ক কেটেছে

করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউ চলার সময়ে দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর লাশ দাফন নিয়ে ব্যাপক আতঙ্ক ছিল। স্বজনরাও লাশ নিতে অনাগ্রহী ছিল। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আরো ভয়াল অবস্থার তৈরি করেছে। মৃত্যু ও সংক্রমণের মাত্রাও বেড়েছে। তবে করোনায় মৃত্যুর পর লাশ নিয়ে আগের সেই আতঙ্ক অনেকটাই কেটেছে। এখন মরদেহ গোসলের পর স্বজনের কাছে হস্তান্তর করা হচ্ছে। স্বজনরাও মরদেহ নিয়ে তাদের পছন্দের কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করছে। লাশ দাফনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য জানা গেছে।

রাজধানী ঢাকায় চারটি সংস্থা করোনা সংক্রমণে মারা যাওয়া রোগীর লাশ দাফন করে থাকে। এগুলো হচ্ছে—আল মারকাজুল ইসলামী (এএমআই), কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, আল রশিদ ফাউন্ডেশন ও রহমত আলম ফাউন্ডেশন। তবে ঢাকার বাইরে একাধিক জেলায় এএমআই এবং কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের শাখা রয়েছে। এ ছাড়া প্রতিটি জেলায় সিভিল সার্জনের মাধ্যমে করোনা সংক্রমণে মৃত্যু হওয়া লাশ দাফনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। সেই প্রশিক্ষণে দায়িত্ব পালন করেছে এএমআই। পুলিশের ২০০ সদস্য এবং সেনা ও নৌবাহিনীর একটি দলও করোনায় মারা যাওয়া রোগীর লাশ দাফনের প্রশিক্ষণ নিয়েছে। ১০টি পৌরসভায়ও ইউএনডিপি এবং এএমআই যৌথভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছে।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে কোনো রোগীর মৃত্যুর পর লাশ দাফনকারী সংস্থাগুলোকে ফোনে খবর দেওয়া হয়। এই কাজটি করা হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের যুগ্ম সচিব আবদুল্লাহ হিল আজমের তত্ত্বাবধানে। টেলিফোনে খবর পেয়ে সংস্থাগুলো হাসপাতাল থেকে লাশ সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে নিয়ে যায় গোসল করানোর জন্য। আবার কখনো রোগীর স্বজন বা হাসপাতালের লোকজনও সংস্থাগুলোর নির্ধারিত স্থানে লাশ নিয়ে যায়। লাশের গোসল দেওয়া, কাফন পরানো ও জানাজা শেষে লাশ স্বজনদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। আবার কখনো সংস্থার লোকজনই কবরস্থানে নিয়ে লাশ দাফন করে।

সংস্থাগুলো সব ধর্মের লোকদেরই নিজ নিজ ধর্ম মতে লাশ দাফন বা সৎকারের ব্যবস্থা করে থাকে। এ জন্য ধর্মীয় রীতিনীতি পালনের জন্য সংস্থায় প্রতিটি ধর্মের লোক রয়েছে। মুসলিম সম্প্রদায়ের লাশ সংস্থাগুলো সরাসরি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে। আবার বেওয়ারিশ হলে কবরস্থানে দাফনের ব্যবস্থা করে। সনাতন, বৌদ্ধ বা খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বী কারো লাশ হলে প্রথম উদ্যোগটিই থাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তরের। কারো স্বজনরা লাশ নিতে অনাগ্রহী হলে বা স্বজন পাওয়া না গেলে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পোস্তখোলা ও নারায়ণগঞ্জ শ্মশানের পুরোহিত, খ্রিস্টান হলে পুরান ঢাকায় তাদের গির্জায় এবং বৌদ্ধ হলে ঢাকাস্থ ধর্মীয় প্রধানের কাছে লাশ পৌঁছে দেওয়া হয়।

এআরআইয়ের তালিকার তথ্য মতে, দেশে করোনার প্রকোপ দেখা দেওয়ার পর থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সংস্থাটি মোট চার হাজার ১২ জন করোনায় মারা যাওয়া রোগীর মরদেহ দাফন করেছে। তাদের মধ্যে তিন হাজার ৯২৬ জনই ইসলাম ধর্মাবলম্বী। এ ছাড়া ৭৭ জন হিন্দু, পাঁচজন খ্রিস্টান ও দুজন বৌদ্ধ ধর্মের। এর বাইরে চীন ও নাইজেরিয়ার দুই নাগরিকের মরদেহ গোসল ও কাফন পরানো শেষে বাক্সবন্দি করে নিজ নিজ হাসপাতালে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।

এএমআইয়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হামজা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে মৃতের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। এবার লাশও বেশি আসছে। গত বছরের ৮ মে আমাদের সংস্থার মাধ্যমে এক দিনে সর্বোচ্চ ২৭টি লাশ দাফন করা হয়েছিল। এবার গত ১০ এপ্রিল লাশ দাফন করা হয়েছে ৫২টি।’ তিনি বলেন, ‘করোনার প্রথম দিকে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছিল। সে সময় সন্তানও মা-বাবার লাশ নেয়নি। আমরাই কবরস্থান ও শ্মশানে লাশ নিয়ে গেছি। বর্তমানে সেই আতঙ্ক অবশ্য নেই।’

কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের লাশ দাফনের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা খন্দকার সজিবুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে এবার লাশ বেশি আসছে। বেশির ভাগ বয়স্ক রোগীর লাশ।’ তিনি বলেন, ‘লাশ দাফন ও সৎকার খুব সুন্দর প্রক্রিয়ায়ই সম্পন্ন হচ্ছে। সবার সহযোগিতা পাচ্ছি। এ ছাড়া শেষবিদায়ে যাতে কারো অনুভূতিতে আঘাত না লাগে সে জন্য আমরা সৎকারপ্রক্রিয়ায় প্রতিটি ধর্মের লোক রেখেছি।’