kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৩ আষাঢ় ১৪২৮। ১৭ জুন ২০২১। ৫ জিলকদ ১৪৪২

বাংলা একাডেমিই ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ প্রেম

সরকার আমিন

১৬ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



বাংলা একাডেমিই ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ প্রেম

১৪ এপ্রিল, বাংলা নববর্ষের দিন আসরের নামাজের পর মানিকগঞ্জে মায়ের কবরের পাশে সমাহিত হয়েছেন শামসুজ্জামান খান। ৮১ বছরের কর্মকোলাহলময় একটা সৃষ্টিশীল জীবনের অবসান হলো। বাংলা সন-তারিখ নিয়ে তাঁর বেশ গবেষণা ছিল, ছিল ফোকলোরিক কৌতূহল। বাংলা সন শুরুর দিনটিতেই তাঁকে চলে যেতে হলো! তিনি বাংলা একাডেমিতে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন পরিচালক, মহাপরিচালক ও সভাপতি হিসেবে। বাংলা একাডেমিই ছিল তাঁর প্রথম ও শেষ প্রেম।

সপ্তাহখানেক আগে বুলবুলকে ফোন দিলাম। বুলবুল বলল, স্যারের মুখে অক্সিজেন। অবস্থা ভালো না। ফোন রেখে দেব এমন সময় বুলবুল বলল, স্যার বুঝতে পেরেছেন এটা আপনার ফোন। কথা বলতে চাইছেন। বুলবুল ফোনটা মুখের কাছে ধরল। স্যার কিছু অস্পষ্ট কথা বললেন। কিছু শব্দ বুঝতে পারলাম, ‘আমিন’/‘বাংলা একাডেমি’/‘ভালো থেকো’...

তখনো আশা করছিলাম, তিনি ফিরে আসবেন। কারণ ভয়াবহ হার্ট সমস্যার পরও ফিরে এসেছিলেন। বাঁ হাত দিয়ে ডান হাত তুলে আঙুল চেপে তাঁকে লিখতে হতো, তবু তিনি লিখতেন। কৌশলী প্রশাসক ছিলেন; বুঝতেন কোন মানুষের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হবে। প্রায় সময়ই বলতেন, ‘বসো মিয়া, শেখো কিভাবে প্রশাসন চালাতে হয়।’ ধান্দা নিয়ে আসা অতিথি চলে গেলে জিজ্ঞাসা করতেন, ‘কেমন সামাল দিলাম মিয়া?’ বলতাম, স্যার, আপনার চাকরি জাতিসংঘে হলে বেশ হতো! ‘নিন্দা করলা না প্রশংসা করলা’ বলেই মৃদু হাসতেন! মৃদু হাসিটি তাঁর ট্রেডমার্ক ছিল।

শামসুজ্জামান খান আমাকে আর প্রয়াত ড. অনু হোসেনকে অনেক স্পেস দিয়েছিলেন। আমি ঠাস করে তাঁর মুখের ওপর অপ্রীতিকর সত্যও বলে বসতে পারতাম। তিনি রাগ করার বদলে হাসতেন আর একটা ডায়ালগ দিতেন—‘ওই মিয়া, থামো’! একদিন বলেছিলাম, স্যার, আপনি একটা ‘লিপ্সুক!’ একটু থমকে গেলেন। বললাম, ‘জীবন-লিপ্সুক’! হা হা করে হাসলেন। আজ বলছি, সত্যি একজন জীবন-লিপ্সুক মানুষ গত হয়ে গেলেন। জীবনকে উপভোগ করে গেছেন। সফল জীবন ছিল তাঁর।

শামসুজ্জামান খান উপমহাদেশের ইতিহাস নিয়ে খুবই অনুসন্ধানশীল ছিলেন। আমাদের সঙ্গে কথা হলেই মধ্যযুগের মোগল রাজত্বের সেক্যুলার দিকগুলো নিয়ে বলতেন। আসলে তিনি একটি সেক্যুলার রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভব করতে পেরেছিলেন। খুব কষ্ট পেতেন সাম্প্রতিক সময়ের রাজনৈতিক চরিত্রহীনতা দেখে।

শামসুজ্জামান খান ছিলেন মৃদুভাষী মানুষ। খুবই বুদ্ধিমান। তাঁর ভারসাম্যবোধ ছিল। ছিলেন উদার মানবতাবাদী। বাংলাদেশে আধুনিক ফর্মে ফোকলোর চর্চায় তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। এই ফিল্ডে তাঁর অবদান অপরিসীম।

লেখক : কবি ও বাংলা একাডেমির কর্মকর্তা



সাতদিনের সেরা