kalerkantho

শুক্রবার । ২৪ বৈশাখ ১৪২৮। ৭ মে ২০২১। ২৪ রমজান ১৪৪২

তরমুজে খুশি চাষি তবে দাম বেশি

বিক্রেতারা বলছেন, হঠাৎ জোয়ারের প্রভাবে জোগান কম

রোকন মাহমুদ   

১১ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



তরমুজে খুশি চাষি তবে দাম বেশি

রাজধানীর রামপুরা কাঁচাবাজারে একটি তরমুজের দোকানে গত শুক্রবার দুপুরে গিয়ে পাঁচজন ক্রেতা দেখা যায়। মিনিট পাঁচেক দেখেশুনে দরদাম করে কিনলেন মাত্র একজন। কারণ বিক্রেতা দাম কমাবেন না আর ক্রেতা বলছেন দাম অনেক বেশি। দাম বেশি, এটা বাজার ঘুরেও দেখা গেল। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত বছর এই সময়ে আট কেজি ওজনের একটি তরমুজ বিক্রি হয়েছে ১৫০ থেকে ১৬০ টাকায়। সেই একই ওজনের তরমুজ শুক্রবার মালিবাগসহ বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি ৩০ টাকা হিসাবে বিক্রি হয়েছে ২৪০ টাকায়। অর্থাৎ গত বছরের তুলনায় প্রায় ১০০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।

বিক্রেতা জানে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, আট কেজি ওজনের তরমুজ কেনা হয়েছে ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায়। এর সঙ্গে যোগ হবে খরচ। একটা তরমুজে ২০-৩০ টাকা লাভ না হলে চলবে কিভাবে? ক্রেতা আলমগীর বলেন, এই ভরা মৌসুমেও বিক্রেতা এই আকারের তরমুজের দাম চাইছেন ২২০ টাকা। অথচ এটার দাম দেড় শ টাকার ওপরে হওয়ার কথা নয়।

রাজধানীর প্রতিটি বাজারেই ১০ থেকে ১৫টি তরমুজের দোকান দেখা গেল। এ ছাড়া রাস্তার পাশে, গলির ভেতরের দোকান এবং বিভিন্ন মোড়ে তরমুজ বিক্রি করছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। প্রত্যেক বিক্রেতার কাছেই দুই শর ওপরে তরমুজ রয়েছে। তার পরও দাম চড়া। ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতেও প্রতি কেজি তরমুজের দাম ছিল ৩৫ থেকে ৪০ টাকা। এখন মাত্র ১০ টাকা কমে ভরা মৌসুমেও বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়।

এই অবস্থায় নিম্নবিত্ত তো বটেই, অনেক মধ্যবিত্তও তরমুজ কেনা ছেড়ে দিয়েছে। মুগদা বাজারে সকালে বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ প্রায় সাড়ে সাত কেজি ওজনের একটি তরমুজের দরদাম করছিলেন। বিক্রেতা ২১৫ টাকার নিচে নামছেনই না। শেষে ভেবেচিন্তে না কিনেই ফিরে গেলেন আব্দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘যে টাকায় তরমুজ কিনব, সেই টাকায় প্রায় চার কেজি চাল পাব। চাল কেনাটা জরুরি।’

মুগদা বাজারের বিক্রেতা শাহেব আলী বলেন, ঢাকায় তরমুজ আসে মূলত পটুয়াখালীসহ কয়েকটি অঞ্চল থেকে। ওই সব এলাকায় হঠাৎ জোয়ারের পানিতে তরমুজক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে তরমুজের জোগান কম। তবে বাজারে তরমুজের দাম বেশি হওয়ায় কৃষক ভালো দাম পাচ্ছেন বলে জানা গেছে। এ বছর তরমুজের ফলনও ভালো হয়েছে বলে মৌসুমের শুরুতে খবর পাওয়া যায়। সে হিসাবে কৃষক তরমুজ চাষে লাভবান হয়েছেন। গত বছরের চেয়ে এবার তরমুজের উৎপাদন বেশি হবে বলে আশা করছেন চাষি ও কৃষিবিদরা।

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার সাজির হাওলা গ্রামের কৃষক জাহাঙ্গীর হাওলাদার তিন একর জমিতে এ বছর তরমুজ চাষ করেছেন। তাঁর ব্যয় হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা। ক্ষেত বিক্রি করেছেন দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এই কৃষকের মুনাফা হয়েছে এক লাখ টাকা। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘তিন বছর ধরে তরমুজ চাষ করি। ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার বেশি লাভ হয় না, কিন্তু ফলন ভালো হয়। এ বছর লাভ ভালো হয়েছে, তবে ব্যবস্থাপনার ঘাটতি না থাকলে লাভ আরো বেশি হতো।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, গত বছর তরমুজ উৎপাদন হয়েছিল দুই লাখ ৫৪ হাজার ৮১৪ মেট্রিক টন। এ সময় ৩০ হাজার একর জমিতে তরমুজ চাষ করেন কৃষকরা। তবে গত বছর সাধারণ ছুটি থাকায় তরমুজের বিক্রি ছিল খুবই কম। এর আগের বছর উৎপাদন ছিল এক লাখ ৮৭ হাজার টন।

বাউফল উপজেলার চরশৌলা এলাকার মো. ফরহাদ হোসেন টিক্কা ৪২ লাখ টাকা ব্যয় করে ৮০ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। নিজের মূলধন আট লাখ টাকা। ১৫ লাখ টাকা সুদি মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়েছেন। এ ছাড়া দোকান থেকে বাকিতে নিয়েছেন সার ও কীটনাশক। মহাজনকে লাখে ৩০ হাজার টাকা সুদ দিতে হবে। প্রায় অর্ধকোটি টাকা লাভ হতো। কোটি টাকার ফলনও হয়েছিল। কিন্তু সব ভেসে গেছে পূর্ণিমার জোয়ারে। এখন ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা বিক্রি নামবে তাঁর। সর্বস্ব শেষ হয়ে গেছে বলে কান্নায় ভেঙে পড়েন ফরহাদ। তিনি বলেন, তরমুজ চাষ লাভজনক। স্বপ্ন নিয়ে কৃষকরা তরমুজ আবাদ করেন, কিন্তু সরকারের কোনো ব্যবস্থাপনা না থাকায় সব স্বপ্ন জোয়ারে ভাসিয়ে নেয়। পটুয়াখালীর শতাধিক কৃষক পূর্ণিমার জোয়ারে সর্বস্ব হারিয়েছেন।

পটুয়াখালী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এ কে এম মহিউদ্দিন বলেন,  চলতি মৌসুমে ১৪ হাজার ২৩৬ হেক্টর জমিতে তরমুজ আবাদ করা হয়েছে। ফলনও সন্তোষজনক, লাভও বেশ ভালো হবে।

[প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন কালের কণ্ঠ’র পটুয়াখালী প্রতিনিধি এমরান হাসান সোহেল এবং রাঙ্গাবালী প্রতিনিধি এম সোহেল।]



সাতদিনের সেরা