kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

একই মুখে কাক ও কোকিলের ডাক

কে এম সবুজ, ঝালকাঠি   

১০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৩ মিনিটে



একই মুখে কাক ও কোকিলের ডাক

তিনি পশু-পাখির ডাক শুনিয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়ে আসছেন ছোটবেলা থেকেই। মুখ দিয়ে লঞ্চের হর্ন বাজানো, বাদ্যের সুর তোলা, নবজাতকের কান্না এবং সংগীত পরিবেশনায়ও রয়েছে তাঁর সুনাম। তাঁর এসব শুনতে এলাকার নানা অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। সময় পেলে বাড়িতে আসর বসিয়েও এসব শোনান তিনি। প্রতিভাবান এই ব্যক্তির নাম ইউনুস হাওলাদার (৪৮)। তাঁর বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটি পৌর এলাকার পূর্ব নাঙ্গুলী গ্রামে।

নলছিটি শহর থেকে তিন কিলোমিটার দূরে নাঙ্গুলী। আড়াপোল থেকে ডান দিকে আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে কিছুদূর গেলেই ছোট একটি টিনের ঘর। এই ঘরেই সপরিবার বসবাস দিনমজুর ইউনুস হাওলাদারের। সম্প্রতি ওই বাড়িতে গেলে দেখা হয় তাঁর সঙ্গে। কৃষিকাজ করে ঘামে ভেজা শরীর কিছুটা মুছে বসে পড়েন খাবার খেতে। ফাঁকে ফাঁকে কথা হয় তাঁর সংগ্রামী জীবন নিয়ে। ছোটবেলা থেকেই পরিশ্রমী ইউনুস অন্যের কাজ করতে করতে এখন হাঁপিয়ে উঠেছেন। ভাত খাওয়া শেষে ঘরের সামনে একটি চৌকিতে বসেন। সামনে জড়ো হয় শিশু, নারী ও বয়স্ক মানুষ। পড়ন্ত বিকেলে দিনের সব ক্লান্তি দূর করতে আসর বসান পশু-পাখির ডাকের। সেখানে মোরগ, বিড়াল, কোকিল, কাক, শিয়াল—কত জীবজন্তুর ডাক অনায়াসে অবিকল শোনালেন। মনে হচ্ছিল বনের পশু-পাখিরা ছুটে এসেছে লোকালয়ে। একতারা, দোতারার সুরও তুললেন মুখ দিয়ে। লঞ্চের হর্ন ও নবজাতকের কান্নার শব্দও হুবহু শোনালেন।

ইউনুস ও তাঁর পরিবার জানায়, কৃষিকাজ, রাজমিস্ত্রির সহকারী, অন্যের বাড়িতে দিনমজুরিই ইউনুসের পেশা। এ থেকে রোজগার দিয়েই চলে সাত সদস্যের সংসার। দারিদ্র্য পিছু না ছাড়লেও স্ত্রী, তিন ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সুখী তিনি। অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করার পর অভাবে শেষ হয়ে যায় তাঁর শিক্ষাজীবন। তবে সন্তানদের স্কুল ও মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। বাবা খবির উদ্দিন হাওলাদারের সঙ্গে মাঠে কাজ করতে গিয়েই পশু-পাখির ডাক শুনে রপ্ত করেন তিনি। যত দিন বেঁচে আছেন, তত দিনই তাঁর গুণাবলি দিয়ে মানুষকে আনন্দ দিয়ে যেতে চান ইউনুস। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে অন্যের বোঝা কাঁধে বইতে কষ্ট হচ্ছে তাঁর। তাই তিনি একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান অথবা পশু-পাখির খামার করে ভালো থাকতে চান। কিন্তু অর্থাভাবে এসবই তাঁর কাছে স্বপ্ন। স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগতা চান ইউনুস।

ইউনুসের স্ত্রী মাহমুদা বেগম বলেন, ‘তিনি আমাকে যখন প্রথম দেখতে যান, তখনো কোকিলের ডাক ডেকেছিলেন। উনি একজন ভালো মানুষ, সারা জীবন উনার সঙ্গেই কাটাতে চাই। স্বামীর আয় কম, কিন্তু মনটা অনেক বড়। আমাদের ভালো একটি বসতঘর নেই। কোনো রকমে চারপাশে টিনের বেড়া দিয়ে সন্তানদের নিয়ে বাস করছি। যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে আমাদের সংসার।’

ইউনুসের প্রশংসায় পঞ্চমুখ এলাকার মানুষ। প্রতিবেশী মাসুম হাওলাদার বলেন, ‘ইউনুস হাওলাদার একজন কৃষক। তিনি অত্যন্ত সৎ ও ভালো মানুষ। তাঁর প্রতিভা রয়েছে। তিনি মানুষকে আনন্দ দেন পশু-পাখির ডাক শুনিয়ে। আমরা মাঝেমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানিয়ে এসব ডাক শুনি। তাঁর অর্থনৈতিক অবস্থা খুবই খারাপ। তাঁকে সবাই সহযোগিতা করলে তিনি একটু ভালো থাকতে পারতেন।’

দক্ষিণ মালিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিজানুর রহমান বলেন, ‘ইউনুস আমার প্রতিবেশী। তাঁকে প্রায়ই দেখি মাঠে কাজ করতে, আবার বাড়িতে আসর বসিয়ে পশু-পাখির ডাক শোনাতে। তিনি আমাদের গ্রামের গর্ব।’



সাতদিনের সেরা