kalerkantho

মঙ্গলবার । ৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৮। ১৮ মে ২০২১। ৫ শাওয়াল ১৪৪

দাবদাহে আমের ফলন বিপর্যয়ের শঙ্কা

আহসান হাবিব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও মো. হারুন আল রশীদ, ধামইরহাট (নওগাঁ)   

১০ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



বাগান মালিক ও উৎপাদনকারীরা প্রতিবছরই আমের উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগে থাকেন। সেরা ফলন নিশ্চিত করতে সর্বাত্মক চেষ্টা থাকে তাঁদের। এ ক্ষেত্রে বৈরী আবহাওয়াই বড় বাধা। মিজ পোকার আক্রমণ, কুয়াশার কারণে হপারের আক্রমণ, খরা, দাবদাহ, ঝড়, শিলাবৃষ্টি, অসময়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বন্যা ও অতিবর্ষার মতো প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা মোকাবেলা করাটা অনেক ক্ষেত্রেই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এবার তাঁদের দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দাবদাহ।

আম উৎপাদনে চাঁপাইনবাবগঞ্জ বরাবরই প্রধান ক্ষেত্র। কয়েক বছর ধরে নওগাঁয় ব্যাপক সংখ্যায় বেড়েছে আমের বাগান। বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত এই জেলার ধামইরহাট উপজেলার উঁচু অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ জমিতে আমের বাগান গড়ে উঠেছে। এই দুই জেলায় এবার গাছে গাছে ৯৫ শতাংশ মুকুল দেখে আশান্বিত হয়ে উঠেছিলেন আম চাষিরা, কিন্তু অনাবৃষ্টি আর দাবদাহ আমের ফলনকে শঙ্কায় ফেলে দিয়েছে।

তিন সপ্তাহ আগে টানা তিন-চার দিন আকাশ মেঘলা থাকায় রস শুকাতে না পারায় ছত্রাক বাসা বাঁধা এবং পরে রোদে ৫০ শতাংশ মুকুল শুকিয়ে ঝরা শুরু হয়। অনাবৃষ্টি ও দাবদাহের কারণে ঝরে পড়ছে গুটি। কৃষি বিভাগ এবার বাম্পার ফলনের কথা বললেও আম চাষি ও বাগান মালিকদের কেউই এই মতের সঙ্গে একমত হতে পারছেন না।

তবে আম চাষিরা প্রকৃতির মর্জির ওপর নির্ভর করে বসে নেই। আম ঝরে পড়া ঠেকাতে বাগানে বাগানে রাত-দিন চলছে সেচ প্রদান। তাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে। আবার অনেকেই পুঁজির অভাবে ঠিকমতো সেচ দিতে পারছেন না। তাঁরা তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে, কখন বৃষ্টির দেখা মিলবে। শ্যালো মেশিনে সেচ দিতে গিয়ে পানির স্তর নেমে যাওয়ায় দুই থেকে তিন গুণ সময় বেশি লাগছে।

আম চাষি আকতারুল ইসলাম, কাইয়ুম আলীসহ অনেকেরই মন্তব্য, ‘আশা করেছিলাম, গত কয়েক বছরের চেয়ে এবার অনেক বেশি উৎপাদন হবে, কিন্তু প্রায় তিন সপ্তাহ আগে কুয়াশা ও আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকায় ৫০ শতাংশ মুকুল নষ্ট হয়ে যায়। ১০-১২ দিন থেকে তাপমাত্রা বৃদ্ধি বড় শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নজরুল ইসলাম জানান, জেলায় ৩৪ হাজার ৭৩৮ হেক্টর জমির আমবাগানে এবার আড়াই লাখ টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শরিফুল ইসলাম বলেন, আম চাষিরা যতটা ক্ষতির আশঙ্কা করছেন ততটা ক্ষতির আশঙ্কা নেই বলা যায়। যে পরিমাণ মুকুল এসেছিল এবং যতটা দানা বেঁধেছে, তার এক ভাগ টিকলেও শতভাগ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হবে। কৃষি বিভাগ মাঘ মাস থেকেই মাঠে কাজ করছে। আবহাওয়া ও পরিবেশ পরিস্থিতি বুঝে সেচ প্রদান, স্প্রেসহ সব ধরনের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

ধামইরহাটে গুটি আম ঝরে পড়ছে : লাভজনক ফসল বিবেচনায় নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলার কৃষকরা ব্যাপকভাবে আমবাগান তৈরিতে ঝুঁকে পড়েছেন। আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা মিলিয়ে প্রায় ৬৭০ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে অনাবৃষ্টির কারণে এসব বাগানের গুটি আম ঝরে পড়ছে।

বেশির ভাগ বাগানে নাক ফজলি, ল্যাংড়া, ফজলি, আম্রপালি, বারি-৪, ৭ ও ১১ জাতের আমগাছ রয়েছে। এ ছাড়া কিছু কিছু এলাকায় গৌড়মতি, ক্ষীরশাপাতি, হাঁড়িভাঙা, কুমরজালী ও দেশি জাতের গুটি আম রয়েছে। এ বছর আমগাছে মুকুল আসার সময় পর্যন্ত আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূলে ছিল। প্রতিটি বাগানের গাছগুলো মুকুলে ভরে গিয়েছিল। এরই মধ্যে মুকুল থেকে গুটি বেরিয়েছে, কিন্তু অনাবৃষ্টি ও দাবদাহে অনেক গাছের মুকুল ও গুটি ঝরে যাচ্ছে।

ধামইরহাট ইউনিয়নের বড় চকগোপালের তরুণ কৃষি উদ্যোক্তা কাইছার আলমগীর পনি বলেন, ‘জয়জয়পুর মৌজায় ৬৬ শতাংশ জমিতে আমার আমের বাগান রয়েছে। বৃষ্টি না হওয়ায় বাগানের গাছগুলো থেকে গুটি আম ঝরে যাচ্ছে। বাগানে হালকা সেচ দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলার চেষ্টা করছি।’

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোছা. শাপলা খাতুন বলেন, এবার প্রতিটি বাগানেই মুকুল থেকে প্রচুর গুটি বেরিয়েছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে আম চাষিদের বাগানে হালকা পানি সেচ এবং ইউরিয়া ও বোরন মিশ্রণ করে স্প্রে করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বাণিজ্যিকভাবে যেসব বাগান তৈরি হয়েছে, সেগুলোতে সেচের ব্যবস্থা রয়েছে। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টি হলেও বর্তমানে এই এলাকার আমবাগান মোটামুটি ভালো রয়েছে।