kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ বৈশাখ ১৪২৮। ১০ মে ২০২১। ২৭ রমজান ১৪৪২

উদাসীনতায় বাড়ছে দুর্ঘটনায় নির্মাণ শ্রমিক মৃত্যুর হার

মোবারক আজাদ   

৮ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



নির্মাণাধীন ভবন থেকে পড়ে শ্রমিকের মৃত্যু কিংবা নির্মাণাধীন ভবনের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় নির্মাণসামগ্রী পড়ে পথচারীর মৃত্যু—এ ধরনের সংবাদ প্রায়ই প্রকাশিত হয়। আবার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মৃত্যু কিংবা অঙ্গহানি হয়ে পঙ্গু হওয়ার বেশির ভাগ ঘটনা আড়ালেও থেকে যায়। এর মূল কারণ, একটি ভবন নির্মাণের সময় যে নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি তা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখভাল করার দায়িত্ব যাদের (শ্রমিক নিয়োগদানকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও ভবন মালিক) তাদের উদাসীনতা। ফলে ক্রমে বাড়ছে নির্মাণাধীন কাজকেন্দ্রিক আহত ও নিহতের সংখ্যা।

নির্মাণকাজ চলার সময় দুর্ঘটনাজনিত কারণে কোনো শ্রমিক মারা গেলে ক্ষতিপূরণের সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। একইভাবে ভবন নির্মাণেও রয়েছে সুনির্দিষ্ট বিল্ডিং কোড। তবে কোনো ভবন নির্মাণের সময় নিচ দিয়ে চলাচলের সময় ওই ভবন থেকে নির্মাণসামগ্রী পড়ে যদি কোনো পথচারী মারা যান সে ক্ষেত্রে প্রতিকার চেয়ে কোনো আইন নেই। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির পক্ষে আইনগত কোনো প্রতিকার চাইতে পারেন এমন কোনো আইনের উল্লেখ নেই শ্রম আইনে।

নির্মাণ শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণের আইন থাকলেও কেউ আইনের আশ্রয় নিয়েছেন বলে জানা যায়নি। মূলত শ্রমিকরা দরিদ্র হওয়ায় এই পথে হাঁটেন না কেউ। এই পরিস্থিতিতে প্রায় প্রতিটি ঘটনায় পার পেয়ে যায় দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিরা। ভবন নির্মাণ কোডে কর্মকালে শ্রমিকদের জন্য সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলা থাকলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। ফলে বারবার ঘটছে দুর্ঘটনা। এমনকি বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনায় মামলা পর্যন্ত করা হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায় সারেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু ভবন নির্মাণ কোড মানা এবং শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়টি অবহেলায়ই থেকে যায়।

নির্মাণ খাতে বছরে দুর্ঘটনায় কতজন নিহত কিংবা আহত হয় এর কোনো সঠিক পরিসংখ্যানও নেই সংশ্লিষ্ট কারো কাছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের তথ্যে জানা যায়, ২০২০ সালে কর্মস্থলে দুর্ঘটনায় ৮৬ জন নির্মাণ শ্রমিক মারা গেছে। আর ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত দুর্ঘটনায় বছরে গড়ে মারা গেছে ১১৫ জন শ্রমিক।

অন্যদিকে ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) তথ্য মতে, ২০২০ সালে দুর্ঘটনায় ১৩৭ জন শ্রমিক মারা গেছে। চলতি বছরের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে কেবল রাজধানীতে নির্মাণাধীন ভবনে কাজ করতে গিয়ে মারা গেছে ১০ জন শ্রমিক। এর মধ্যে রয়েছে রাজমিস্ত্রি, পাইপ ফিটিং মিস্ত্রি, রং মিস্ত্রি ও সাধারণ শ্রমিক।

দুর্ঘটনায় মারা যাওয়া একাধিক শ্রমিকের সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বললে তারা উল্টো প্রশ্ন করে—কে যাবে এসব নিয়ে মামলা করতে? ক্ষতিপূরণ চাইতে? আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্মাণ শ্রমিকরা দরিদ্র হওয়ায় তাদের পরিবারের কেউ সাহস করে না ভবন মালিক কিংবা ঠিকাদারের বিরুদ্ধে মামলা করার। এ পরিস্থিতিতে সামান্য ক্ষতিপূরণ পাওয়া গেলে তাতেই তারা সন্তুষ্ট থাকে।

রামপুরার একটি বহুতল নির্মাণাধীন ভবনের শ্রমিক মো. আরিফ বলেন, ‘কর্মস্থলে মারা গেলে ক্ষতিপূরণের মোটা অঙ্কের টাকা পাবে পরিবার এটা কেউ আশা করে না। আমাদের সবার দাবি, কর্মস্থল হোক নিরাপদ। যাতে আর একটি মানুষও দুর্ঘটনায় প্রাণ না হারায়। কোনো শ্রমিকের পরিবারকে আর যেন পথে বসতে না হয়।’

শ্রম আইনে কর্মক্ষেত্রে কোনো শ্রমিক মারা গেলে আগে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নিয়ম ছিল। এই আইনে ২০১৮ সালে ক্ষতিপূরণ বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হয়। আহতরা স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে গেলে ক্ষতিপূরণের টাকাও দ্বিগুণ করে আড়াই লাখ করা হয়েছে।

দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা গেছে, নির্মাণাধীন ভবনে নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে মজবুত নেট বা বেড়া ব্যবহারের কথা থাকলেও তা ব্যবহার করা হয় না। রয়েছে সরু সিঁড়িতে আলোর স্বল্পতা, এলোপাতাড়ি রড, বালু, ইটসহ নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা, শ্রমিকদের গ্লাভস, হেলমেট ব্যবস্থা না করা, বুট জুতা ব্যবহার না করা, ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্রপাতির ব্যবহার, ঝুলন্ত অবস্থায় কাজের সময় বেল্ট ব্যবহার না করা ইত্যাদি।

ইমারত নির্মাণ শ্রমিক ইউনিয়ন বাংলাদেশের (ইনসাব) সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাজ্জাক  বলেন, ‘একদিকে কর্মস্থলের নিরাপত্তা নেই, শ্রম আইনে অনেক কথা বলা হলেও বাস্তবে তার কোনো প্রয়োগ নেই। এই অবস্থার মধ্যে আমরা কাজ করছি। শ্রমিকদের ঝুঁকি এবং কর্মস্থলে ঝুঁকি নিরসনে সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রদক্ষেপ নিতে অনুরোধ করছি।’

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক তাসনোভা আহমেদ অনন্যা বলেন, কোনো নির্মাণ শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে আহত-নিহতের শিকার হয়ে আমাদের কাছে এলে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে সাহায্য-সহযোগিতা করা হয়। সহযোগিতার পরিমাণ ২৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নির্মাণ শ্রমিকদের আহত-নিহতের ঘটনায় ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা থাকলেও নির্মাণাধীন ভবনে যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা না নেওয়ার কারণে কোনো পথচারী মারা গেলে সে বিষয়ে ক্ষতিপূরণ বা শাস্তির কথা শ্রম আইনে নেই। তবে ভুক্তভোগীরা ভবন মালিকের বিরুদ্ধে মামলাসহ বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারবেন।

রাজউকের সদস্য (উন্নয়ন) মেজর (অব.) ইঞ্জিনিয়ার সামসুদ্দীন আহমদ চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে সংশোধনী বিধিমালা শিগগির আসবে। এটা ভবন মালিক ও ঠিকাদারদের মেনে চলতে নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।’



সাতদিনের সেরা