kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

সিদ্ধিরগঞ্জে তাণ্ডব চালায় ‘তৃতীয় পক্ষ’

হেফাজতের হরতাল

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি   

২ এপ্রিল, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



হেফাজতে ইসলামের ডাকা গত রবিবার হরতালের দিন নারায়ণগঞ্জ শহর শান্ত থাকলেও উল্টো ছবি ছিল ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায়। এই মহাসড়কের সাইনবোর্ড থেকে শিমরাইল মোড় পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকা হয়ে পড়েছিল রণক্ষেত্র। হরতাল সমর্থক পিকেটারদের তাণ্ডবে রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স থেকে শুরু করে সংবাদকর্মীরাও রেহাই পাননি।

সড়কে টায়ার ও কাঠের গুঁড়ি জ্বালিয়ে উল্লাস, বৈদ্যুতিক খুঁটি, গাছ, ভারী পাথরখণ্ড দিয়ে সড়ক অবরোধ, পুলিশের দিকে ঢিল ছোড়া—কোনো কিছুই বাদ রাখেনি পিকেটাররা। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এই ধ্বংসযজ্ঞে নেতৃত্ব দিয়েছেন জিন্সের প্যান্ট, টি-শার্ট পরা কিশোর-যুবকরা। এই কিশোর-যুবক কারা—প্রশাসন এরই মধ্যে কাউকে কাউকে চিহ্নিত করতে পারলেও তদন্তের স্বার্থে নাম প্রকাশ করেনি। তবে জানা গেছে, হেফাজতের হরতালের সুযোগ নিয়ে তৃতীয় পক্ষ ‘গেম’ খেলতে চেয়েছে। তাণ্ডবে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে পক্ষটি সেদিন নারায়ণগঞ্জে কয়েকটি লাশ আশা করেছিল, যা নিয়ে তারা কোনো একটি পক্ষের ওপর দায় চাপানোর কৌশল এঁটেছিল। তবে প্রশাসন ধৈর্যশীলতার পরিচয় দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানায়, হেফাজতের হরতাল মোকাবেলায় মাঠে থাকার সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন স্থানীয় ছাত্রলীগ-যুবলীগের নেতাকর্মীরা। কিন্তু ওপরের নির্দেশ, প্রশাসনের অনুরোধে তাঁরা আর রাজপথে নামেননি। এর ওপর নারায়ণগঞ্জ জেলা হেফাজতের আমির মাওলানা আবদুল আউয়ালের পিকেটিং করতে সড়কে না নামার ঘোষণায় তাঁর অনুসারীরাও সকাল ১০টার মধ্যেই সড়ক থেকে সরে যায়। সাইনবোর্ডেও সেই চিত্র দেখা যায়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে গণপরিবহনসহ সব ধরনের যান চলাচল শুরু হয়ে যায় ১০টার পর থেকেই। কিছুক্ষণের মধ্যে আশাপাশও স্বাভাবিক হয়ে ওঠে। কিন্তু বিপত্তি ঘটে দুপুর ১২টার দিকে। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক উত্তপ্ত করতে জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট পরা অচেনা কিশোর-যুবকরা জড়ো হতে থাকেন সাইনবোর্ডের মিতালী মার্কেটে। আর এই পরিকল্পনায় যুক্ত হন নারায়ণগঞ্জের বিএনপিদলীয় এক সাবেক সংসদ সদস্য, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম ও হেফাজতের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব মনির হোসেন কাশেমী, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইকবাল হোসেন ও জেলা আওয়ামী লীগের এক নারী নেত্রী। তাঁরা ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে ওই যুবকদের নানা স্পটে অবস্থান করে গাড়ি পোড়ানোসহ তাণ্ডব চালানোর নির্দেশনা দেন। সে অনুযায়ী বিকেল ৪টার পর থেকে তাঁরা কাজও শুরু করেন। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে তাঁরা কয়েকটি লাশ চেয়েছিলেন। কিন্তু পুলিশ ধৈর্যের পরিচয় দেওয়ায় তা সম্ভব হয়নি।

তথ্যানুসন্ধানে ও একাধিক সূত্রে জানা গেছে, হেফাজত নেতা মনির হোসেন কাশেমী হরতালের বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের সাবেক এক বিএনপিদলীয় এমপি ও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের একজন নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিকল্পনার ছকটি তৈরি করেন। মূলত নাশকতার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় দুটি কারণে। প্রথমটি হলো, হেফাজতের বর্তমান নেতৃত্বকে অকার্যকর প্রমাণ করে কাশেমীপন্থীদের সেখানে প্রতিষ্ঠিত করা। দ্বিতীয়ত, সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় ব্যাপক নাশকতা চালিয়ে আওয়ামী লীগ ও ওই আসনের এমপি শামীম ওসমানের অবস্থানকে দুর্বল করা। কারণ বিএনপির ওই সাবেক এমপির সঙ্গে সেই আওয়ামী লীগ নেত্রীর আত্মীয়তা ও সখ্যের বিষয়টি অনেকটাই ওপেন সিক্রেট।

জানা গেছে, হেফাজতের ডাকা গত রবিবারের হরতালের আগে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজতের শীর্ষস্থানীয় নেতারা শহরের একটি মাদরাসায় রুদ্ধদ্বার বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন। ওই বৈঠকে বেশির ভাগ নেতাই হরতালে নাশকতা বা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে না জড়ানোর পক্ষে মত দেন। কিন্তু মনির হোসেন কাশেমীপন্থী কয়েকজন নেতা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন। বিষয়টি কাশেমীকে জানালে তিনি কেন্দ্রীয় হেফাজতের নেতাদের অবগত করেন। মূলত কাশেমী গত হরতালে নাশকতা সৃষ্টির মূল ছকটি আঁকেন দাবি করে ওই সূত্র জানিয়েছে, কাশেমীর সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ মহানগর হেফাজতের সভাপতি মাওলানা ফেরদাউসের দূরত্ব সৃষ্টি হয় গত সংসদ নির্বাচন ঘিরে। বেশ কিছু ওয়াজ মাহফিলে মাওলানা ফেরদাউস ও ওলামা পরিষদের নেতারা এমপি শামীম ওসমানকে দাওয়াত করার কারণে কেন্দ্রীয় হেফাজতের কাছে এ নিয়ে নালিশও করেছিলেন কাশেমী।

এদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ-ফতুল্লা আসনের সরকারদলীয় এমপি শামীম ওসমান হেফাজতের হরতালে এমন তাণ্ডবের খবরেও কেন মাঠে নামেননি, এ নিয়েও চলছে জল্পনা-কল্পনা। এ ব্যাপারে শামীম ওসমান বলেন, ‘আমাদের হরতালের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে মাঠে থাকার প্রস্তুতি ছিল। কিন্তু মাঠে নামলে পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে ভয়াবহ কিছু ঘটানো হতে পারে, এমন তথ্যে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা এসেছিল যেন মাঠে না নামি। শেষ পর্যন্ত হয়েছেও তা-ই। নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন ও আইন- শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ধৈর্য নিয়ে পিরস্থিতি মোকাবেলা করেছিল। বিকেলের পর হেফাজত মাঠ ছাড়লেও ২০টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া হলো, এরা কারা? গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর এমন নগ্ন হামলা করল কারা?’

এক প্রশ্নের জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘নাশকতাটি যে পূর্বপরিকল্পিত, তা খোদ নারায়ণগঞ্জ হেফাজতের জেলা ও মহানগরের শীর্ষ নেতারাই স্বীকার করেছেন। জেলা হেফাজতের আমির নাশকতার বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়ে হেফাজত থেকে পদত্যাগের ঘোষণা দিলেন আর মহানগর হেফাজতের সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান গণমাধ্যমে বলেছেন, নাশকতার পেছনে বিএনপি-জামায়াতের লোকজন জড়িত। আমার তো মনে হয় দলের ভেতরে ও বাইরের পরিকল্পনাতেই এমনটি করা হয়েছে।’

নিজ দলের কেউ জড়িত থাকতে পারে বলে মনে করছেন কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে শামীম ওসমান বলেন, ‘একজন বঙ্গবন্ধু তৈরি হতে হাজার বছর লাগে আর খন্দকার মোশতাক জন্ম হতে বছর লাগে। আমি চাই এই নারকীয় নাশকতার পেছনের প্রকৃত কুশীলবদের নাম প্রশাসনের তদন্তে বেরিয়ে আসুক।’

এ ব্যাপারে পুলিশ সুপার মো. জায়েদুল আলম বলেন, ‘আমরা প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে চেয়েছি, যেন একটি প্রাণও না ঝরে। সে কারণে আমরা ধৈর্য ধরেছি। আর জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট পরে যারা তাণ্ডব চালিয়েছে, আমি মনে করি তারা হেফাজতের কেউ না।’

নারায়ণগঞ্জ মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি ফেরদাউসুর রহমান বলেন, ‘জিন্স প্যান্ট ও টি-শার্ট পরা লোকজন আমাদের হেফাজতের কেউ না। প্রশাসনের কাছে অবশ্যই ভিডিও ফুটেজ আছে। আমরাও চাই, তাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনা হোক।’

এদিকে অভিযোগ সম্পর্কে হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতা মনির হোসেন কাশেমী জানান, তিনি ব্যাংকক গিয়েছিলেন একটি বৈঠকে যোগ দিতে, এটা সত্য। কিন্তু নারায়ণগঞ্জে হরতালে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগটি ভিত্তিহীন।

এ ব্যাপারে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ বলেন, ‘বিএনপিকে ঘায়েল করতে এবং প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার জন্যই তাণ্ডবের ঘটনায় আমাদের জড়ানো হচ্ছে।’

সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি মশিউর রহমান জানান, তাণ্ডবের ঘটনায় গত সোমবার রাতে পুলিশ বাদী হয়ে পাঁচটি এবং র‌্যাব বাদী হয়ে একটি মামলা করেছে।



সাতদিনের সেরা