kalerkantho

বুধবার । ৯ আষাঢ় ১৪২৮। ২৩ জুন ২০২১। ১১ জিলকদ ১৪৪২

‘প্রবাহ’র খাবার পানি

জহিরুল ইসলাম, মানিকগঞ্জ থেকে ফিরে   

২২ মার্চ, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



‘প্রবাহ’র খাবার পানি

‘সাটুরিয়ার পানি আসলেই খুব খারাপ। পানিত আয়রন আছিলো, আর্সেনিক আছিলো। আয়রনে আগে শরীরে স্পট পইড়া যাইতো। গোসল করলে চুল একটার লগে আরেকটা লাইগা যাইতো। এহন পানির বড় বড় ট্যাংকি বসাইছে। পানি সুন্দর বাইর অইতাছে। কাছে-কিনারে যতো লোক আছে সবাই উপকার পাইতাছে।’

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার তিল্লি ইউনিয়নের বাসিন্দা রুমা বেগম বলছিলেন কথাগুলো। গত সোমবার সরেজমিনে এলাকায় গিয়ে আলাপকালে পানি নিয়ে আগের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন আরেক নারী মরিয়ম। তিনি বলেন, ‘আগে মাটির হাঁড়ি বসাইয়া চাইরটা খুঁটা গাইড়া ওইখানে বালি দিতাম। তার পরে ইটের কুচি (কংক্রিট) দিতাম, এরপর একটা ছিদ্র কইরা নিতাম। ওখান থেইক্কা পানি পড়তো। হেই পানি আমরা খাইতাম। এহন ওইডা (ফিল্টার) ভাইঙ্গা ফালাইছি।’

এক যুগ ধরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশুদ্ধ খাওয়ার পানি সরবরাহ নিশ্চিত করে আসছে ‘প্রবাহ’। সারা দেশে ‘প্রবাহ’র ১১০টি প্লান্টের মাধ্যমে দুই লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষকে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তিল্লি ইউনিয়নও এই সুবিধার আওতায় এসেছে। আর এই ইউনিয়নের সুবিধাভোগী বেশির ভাগ মানুষই এমন মন্তব্য করেছে।

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের পাশাপাশি বিশুদ্ধ খাওয়ার পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে এবং সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে এই প্রকল্প। এর স্বীকৃতি হিসেবে এশিয়া রেসপনসিবল এন্টারপ্রেনারশিপ অ্যাওয়ার্ডও পেয়েছে একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত বেসরকারি এই প্রকল্প।

‘প্রবাহ’ প্রকল্পের অধীনে মানিকগঞ্জে ৯টি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট রয়েছে। এর মধ্যে সাটুরিয়ার ৫ নম্বর তিল্লি ইউনিয়নে রয়েছে দুটি। একটি পশ্চিম তিল্লির পীরবাড়ির সামনে, অন্যটি চরপাচুটিয়ায়। এই দুটি প্লান্টের আওতায় ‘প্রবাহ’র পানির সুবিধা পাচ্ছে প্রায় ৪০০ পরিবার।

‘প্রবাহ’ প্লান্ট সম্পর্কে সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আশরাফুল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এই এলাকায় পানিতে আয়রন বেশি। আর্সেনিকও থাকতে পারে। এই উপজেলার এমন কোনো জায়গা পাইনি, যেখানে পানিতে অতিরিক্ত আয়রন নেই। আমরা নিজেরাও এই সমস্যায় জর্জরিত। এই পানি পান বা ব্যবহারে স্বাস্থ্যঝুঁকি প্রবল। পানি সমস্যা সমাধানে সরকারের নানা উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরও এগিয়ে আসা ইতিবাচক।’

জানা যায়, মানিকগঞ্জে নিরাপদ খাওয়ার পানির সংকট বরাবরের। বিশুদ্ধ পানির অভাব ও আর্সেনিক দূষণের কারণে স্থানীয় লোকজন পানিবাহিত নানা রোগে ভুগত। তাদের এই সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে এখানে স্থাপন করা হয় ‘প্রবাহ’র নিরাপদ খাওয়ার পানির প্লান্ট। ২০০৯ সালে এই প্রকল্প কাজ শুরুর পর থেকে বিশুদ্ধ পানির সংকট ধীরে ধীরে কমে আসে।

জানা যায়, চলতি বছর পর্যন্ত সারা দেশে ‘প্রবাহ’ প্রকল্পের অধীনে ১১০টি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। সেসব প্লান্ট থেকে প্রতিদিন প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ লিটার পানি বিশুদ্ধ করা যাচ্ছে। উপকৃত হচ্ছে দুই লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিল্লি ইউনিয়নের পীরবাড়ির সামনে একটি প্লান্ট থেকে আশপাশের বিভিন্ন বাড়ির মানুষ জগ, বালতি, কলস বা পাতিলে পানি নিয়ে যাচ্ছে। পশ্চিম তিল্লির পীরবাড়ির বাসিন্দা শামসুল আলম বলেন, ‘টিউবওয়েল থাকলেও এলাকায় ডিপ টিউবওয়েল নেই। দু-একটা আছে, সেগুলো ধোয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। আগে আয়রনযুক্ত পানি খেতে হতো। এখন সেই ভোগান্তি থেকে কিছুটা মুক্তি মিলেছে।’

জানা যায়, এসব পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্টের জন্য এলাকার মানুষকে নিয়ে গঠন করা হয়েছে রক্ষণাবেক্ষণ কমিটি। এই কমিটি প্লান্ট রক্ষণাবেক্ষণ করে। চরপাচুটিয়া প্লান্টের সভাপতি রইজ উদ্দিন বলেন, ‘পানি নিয়া খুব সমস্যা আছিলো। গোসল করলে শরীর আঠা আঠা হইয়া যাইতো। প্রবাহর লোকজন প্লান্ট বসাইবো শুইনা জায়গা দিছি। এখন আল্লাহর রহমতে পানি নিয়া সমস্যা নাই।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই প্লান্টের মাধ্যমে ভূগর্ভ থেকে পানি তোলার পর তা থেকে আর্সেনিক, লোহা ও ম্যাঙ্গানিজ অপসারণ করা হয়। শোধনাগারে ভূগর্ভ থেকে গভীর নলকূপের মাধ্যমে পানি তোলার পর বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপ অনুসরণের মাধ্যমে তা পরিশোধন করা হয়। এরপর পরিশোধিত পানি প্লান্টের মূল ট্যাংকে পৌঁছে। পরে ট্যাংক থেকে মানুষ নিরাপদ পানি সংগ্রহ করে।

তিল্লি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মুরসালিন বাবু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আর্সেনিক সমস্যা না থাকলেও আয়রনের জন্য পানি ব্যবহার করা যায় না। তবে আমার ইউনিয়নে দুটি পানি বিশুদ্ধকরণ প্লান্ট কাজে দিচ্ছে। এমন প্লান্ট আরো দরকার। ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড রয়েছে। প্রতি ওয়ার্ডে এই ব্যবস্থা করা গেলে ভালো হতো।’



সাতদিনের সেরা