kalerkantho

বুধবার । ১ বৈশাখ ১৪২৮। ১৪ এপ্রিল ২০২১। ১ রমজান ১৪৪২

কার্ডিওলজিস্ট নেই কোনো কারাগারেই

ওমর ফারুক   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



কার্ডিওলজিস্ট নেই কোনো কারাগারেই

দেশের কারাগারগুলোয় থাকা বন্দিদের মধ্যে যাঁরা কারাগারে বা হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান তাঁদের বেশির ভাগই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। অথচ এমন জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য দেশের ৬৮টি কারাগারের কোনো একটিতেও কার্ডিওলজিস্ট নেই। ফলে কারা কর্তৃপক্ষকে নির্ভর করতে হয় বাইরের হাসপাতালের ওপর।

তবে কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রস্তাবিত হাসপাতালে কার্ডিওলজি বিভাগ খোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে থাকবে আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম ও বিশেষজ্ঞ কার্ডিওলজিস্ট। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হওয়া লেখক মুশতাক আহমেদ কারা হেফাজতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার ঘটনায় কার্ডিওলজিস্টের বিষয়টি আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

জানা গেছে, মুশতাকের মতো অনেক বন্দিই এভাবে স্ট্রোক বা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এসব রোগ সময় না দেওয়ার কারণে বেশির ভাগ রোগীই কারাগারে অথবা হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান। কারাগারে হৃদরোগ শনাক্তের সরঞ্জাম থাকলেও চিকিৎসকের অভাবে সেগুলো খুব একটা কাজে লাগছে না বলে জানা গেছে।

এদিকে লেখক মুশতাকের মৃত্যুর ঘটনায় কারা কর্মকর্তাদের কোনো অবহেলা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর আগে কারা কর্তৃপক্ষ গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে এই কমিটির রিপোর্ট দেওয়ার কথা রয়েছে। তদন্ত কমিটির রিপোর্টে ভবিষ্যতে এ ধরনের মৃত্যু রোধে করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ থাকবে বলে জানা গেছে। জানতে চাইলে অতিরিক্ত আইজি প্রিজনস কর্নেল আবরার হোসেন গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটি তদন্ত শুরু করেছে। রিপোর্ট পেলে পুরো ঘটনাটি জানা যাবে।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের ৬৮টি কারাগারে কার্ডিওলজিস্ট না থাকায় সাধারণ চিকিৎসকরাই স্ট্রোক বা হৃদরোগের বিষয়টি বুঝতে পেরে বন্দিদের বাইরের হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। এরপর অসুস্থ বন্দিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এই রোগগুলো সময় না দেওয়ার কারণে বেশির ভাগ রোগীই কারাগারে বা হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যান।

কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগারে সাধারণ ডাক্তারও নেই। গত বৃহস্পতিবার হাই সিকিউরিটি কারাগারে মুশতাক আহমেদ অসুস্থ হয়ে পড়লে কাশিমপুর-২ কারাগার থেকে চিকিৎসক ডেকে পাঠানো হয়। চিকিৎসক দেখে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই দেশে এই মৃত্যু নিয়ে তোলপাড় চলছে। একটি সূত্রের দাবি, হাসপাতালে নেওয়ার আগে কারাগারেই মারা গেছেন মুশতাক।

জানতে চাইলে এক কারা কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, কারা হেফাজতে কেউ মারা গেলে প্রথমেই তাঁর পরিবারকে মোবাইল ফোনে বিষয়টি জানানো হয়। চিঠিও পাঠানো হয়। সঙ্গে সঙ্গে যে এলাকার কারাগার ওই এলাকার থানাকে অবহিত করা হয়। থানা পুলিশ গিয়ে সুরতহাল রিপোর্ট তৈরির পর তাঁর লাশ পাঠানো হয় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে। ময়নাতদন্ত রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়। যদি ময়নাতদন্ত রিপোর্টে অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর কারণ আসে তাহলে আর তদন্ত করা হয় না। যদি তাঁকে হত্যা করার মতো কোনো তথ্য পাওয়া যায়, তাহলে থানায় মামলা হয় এবং তদন্ত শুরু হয়।

লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুকে অসুস্থতাজনিতই দেখছে কারা কর্তৃপক্ষ। তাঁর মৃত্যুর পর সারা দেশে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় হওয়ার কারণে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে গতকাল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয়েছে সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ড. তরুণ কান্তি শিকদারকে।

সূত্র জানায়, ১৮৯৪ সালের প্রিজন অ্যাক্টের ১৩ ধারা মতে, একজন বন্দির পূর্ণ চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একজন মেডিক্যাল অফিসার প্রতি ২৪ ঘণ্টা অন্তর বন্দিদের শারীরিক পরীক্ষা ছাড়াও তাঁদের অসুস্থতা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার কথা। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা তো দূরের কথা, ২৪ দিনেও চিকিৎসকের দেখা পান না বন্দিরা। গুরুতর অসুস্থ না হলে চিকিৎসাসেবাও মেলে না। মুশতাকের মৃত্যুর পর কারা কর্তৃপক্ষ চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবছে। তারা প্রতিটি কারাগারে অন্তত একজন চিকিৎসক নিশ্চিত করতে চায়। এক কারা কর্মকর্তা জানান, কারাগারে চিকিৎসকরা আসতে চান না। ফলে বন্দিদের চিকিৎসা দেওয়াটা অনেক কঠিন হয়।

মন্তব্য