kalerkantho

শুক্রবার । ৪ আষাঢ় ১৪২৮। ১৮ জুন ২০২১। ৬ জিলকদ ১৪৪২

আশপাশেই আছে জঙ্গিরা আমাকেও মেরে ফেলবে ওরা

রায়ের প্রতিক্রিয়ায় ভাই অনুজিৎ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



আশপাশেই আছে জঙ্গিরা আমাকেও মেরে ফেলবে ওরা

‘আজ বাবা বেঁচে থাকলে কিছুটা হলেও সান্ত্বনা পেতেন। বলতেন, দেরিতে হলেও আমার অভির খুনিদের বিচার হলো। বেঁচে থেকে সন্তানের খুনিদের, জঙ্গিদের ফাঁসি দেখে যেতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু সেটা আর হলো না। সন্তানের খুনিদের বিচারের রায় দেখে না যাওয়ার আক্ষেপ নিয়ে মারা গেলেন বাবা।’ কথাগুলো বলছিলেন জঙ্গি হামলায় নিহত মুক্তমনা বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়ের  ছোট ভাই অনুজিৎ রায়। গতকাল মঙ্গলবার অভিজিৎ হত্যার রায়ের প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তিনি কালের কণ্ঠকে এসব কথা বলেন।

ঘটনার মূল আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে জানিয়ে অনুজিৎ বলেন, ‘অন্য আসামি যারা ধরা পড়েনি, তারা এই রায়ের পর সতর্ক হয়ে যাবে। নতুন কৌশলে সংগঠিত হবে। প্রতিহিংসার আগুন ছড়াবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তমনাদের হত্যা করবে। সব সময় মনে হয়, আমার আশপাশেই আছে জঙ্গিরা। আমাকেও মেরে ফেলবে। তাই ওরা ধরা না পড়লে সমাজে শান্তি আসবে না।’

পদার্থবিদ অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ রায় থাকতেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে করতেন লেখালেখি। পাশাপাশি তিনি পরিচালনা করতেন মুক্তমনা ব্লগ সাইট। যুক্তরাষ্ট্রে থাকতেই তিনি জঙ্গি হামলার হুমকি পান। পরে ২০১৫ সালে অভিজিৎ একুশে বইমেলায় অংশ নিতে দেশে এসেছিলেন। স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে জঙ্গি হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন অভিজিৎ রায়। জঙ্গিদের চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান তাঁর স্ত্রী বন্যা। দেশে-বিদেশে আলোড়িত হয় ওই ঘটনা। এরপর মুক্তমনা লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও অধিকারকর্মীদের ওপর চলতে থাকে একের পর এক হামলা। হত্যাও করা হয় অনেককে। পরবর্তী সময়ে ২০১৯ সালে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) জমা দেওয়া অভিযোগপত্রে বলা হয়, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের (আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) নেতা সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত জিয়াউল হক ওরফে জিয়ার নির্দেশেই সেদিন অভিজিতের ওপর হামলা করা হয়। জিয়াসহ দুজনকে পলাতক দেখিয়ে ছয় আসামির বিরুদ্ধে এ মামলার বিচারকাজ চলে। গতকাল মঙ্গলবার তাদের সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান।

এ ব্যাপারে অভিজিতের ছোট ভাই অনুজিৎ কালের কণ্ঠকে বলেন, “বাবা দাদাকে (অভিজিৎ) খুব ভালোবাসতেন। আদর করে ‘অভি’ ডাকতেন। আর মা আদর করে ‘গুল্লু’ বলে ডাকতেন। আমেরিকাতে থাকতেই দাদাকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিল জঙ্গিরা। এ কারণে দাদাকে দেশে আসতে নিষেধ করেছিলেন বাবা। কিন্তু দাদা দেশকে ভালোবাসতেন, ভাষার মাসে বইমেলায় থাকতে পছন্দ করতেন। মূলত দেশের টানেই স্ত্রীকে নিয়ে দেশে এসেছিলেন।”

আক্ষেপ নিয়ে অনুজিৎ বলেন, “জঙ্গিরা শেষ পর্যন্ত হত্যাই করল দাদাকে। অভির মৃত্যুর পর একটি রাতও ভালো করে ঘুমাতে পারেননি মা-বাবা। ওরা শুধু অভিজিেক হত্যা করে থেমে থাকেনি। ঘটনার রাতে বাবাকেও মোবাইল ফোনে হুমকি দিয়ে বলেছিল আল্লাহর রাস্তায় না ফিরলে পরিবারের সবাইকে হত্যা করবে। সেদিন বাবা ওই জঙ্গিকে বলেছিল, ‘আমার নিরপরাধ ছেলেকে মেরে তোরা সমাজে কী প্রতিষ্ঠিত করছিস? অভি তো তোদের কোনো ক্ষতি করেনি।’ তার জবাবে ওই জঙ্গি সদস্য  ফের জানিয়েছিল, পুরো পরিবারকেই হত্যা করবে ওরা। সে কারণে এখনো পরিবার নিয়ে আমি শঙ্কিত।”

বাবা বেঁচে থাকতে ২০১৮ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মামলার তদন্তের বিষয়ে বাবার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সর্বশেষ ২০১৯ সালেও বাবা তদন্তের আপডেটটা জেনেছিলেন। এরপর বাবার মৃত্যুর পর মা-ও মারা যান। আমি একা হয়ে যাই। ভাইয়ের খুনিদের বিচারের অপেক্ষায় ছিলাম। রায় শুনে কিছুটা খুশি হয়েছি, পুরোপুরি নয়। কারণ এখনো অভি হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী ধরা পড়েনি। তবে যাদের বিরুদ্ধে রায় হয়েছে, এখন তাদের দ্রুত ফাঁসি হলে হয়। শুনেছি, কারাগারে থেকেও জঙ্গিরা বাইরের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, তা ছাড়া যে দুজন বাইরে আছে, তারাও ভয়ংকর। তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করতে না পারলে পরিবারসহ আমিও শঙ্কার মধ্যে থাকব।’



সাতদিনের সেরা