kalerkantho

মঙ্গলবার । ১২ শ্রাবণ ১৪২৮। ২৭ জুলাই ২০২১। ১৬ জিলহজ ১৪৪২

দুর্বল লাইন-ইঞ্জিন দুর্ঘটনার কারণ

আখাউড়া-সিলেট রেলপথ

সজিব ঘোষ, বিশ্বজিৎ পাল বাবু ও ইয়াহইয়া ফজল   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৪ মিনিটে



দুর্বল লাইন-ইঞ্জিন দুর্ঘটনার কারণ

চলতি মাসে আট দিনের ব্যবধানে সিলেট রেলপথে দুটি তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পর দুর্ঘটনা নিয়ে আবার আলোচনা-সমালোচনা চলছে। দুর্ঘটনার কারণ খুঁজতে আজ বুধবার দায়িত্বশীল সবাইকে নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন।

রেল ভবন সূত্র বলছে, সিলেটে বেশি ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার মূল কারণই হলো এখানকার রেললাইনগুলো তুলনামূলকভাবে খারাপ। এর আগে যে কয়েকটা দুর্ঘটনার তদন্ত হয়েছে, সেখানে দেখা যায়, প্রতিটি দুর্ঘটনার কারণ প্রায় আলাদা। কিছু দুর্ঘটনা ম্যানুয়াল ফল্টের কারণে ঘটেছে, কয়েকটার ক্ষেত্রে ট্রেনের গতি বেশি ছিল, কোনো প্রতিবেদনে এসেছে লাইনের অবস্থা খারাপ থাকায় দুর্ঘটনা ঘটেছে। আবার যেহেতু পাহাড়ি এলাকা, ওপরে ওঠা এবং নিচে নামার একটা সমস্যা তো রয়েছেই। সমন্বয়হীনতাও আরেকটা কারণ। একবার দেখা গেল, লাইন খুলে কাজ করার বিষয়টি সঠিক প্রক্রিয়ায় জানানো হয়নি বলে একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে।

রেলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অবশ্য লাইন খারাপের কারণে দুর্ঘটনার বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছেন। তাঁরা বলছেন, গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পারায় তেলবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হচ্ছে। রেলের কোনো কোনো সূত্র বলছে, বগি, লাইন ও সিগন্যাল—এই তিন সমস্যা ছাড়া দুর্ঘটনার কোনো কারণ নেই।

যে সমস্যাই থাকুক না কেন, সেটা সমাধানে ব্যবস্থা কতটা নেওয়া হচ্ছে, সেটা জানার জন্য যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ রেলের অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালক সরদার শাহাদাত আলীর সঙ্গে। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এটা তো রেলের মহাপরিচালক বলবেন, আমি তো ট্রেন চালাই। আমাকে লাইনের যে ক্যাপাসিটি বলে দেবে, আমি সে ক্যাপাসিটি ধরে চালাব। মেকানিক্যাল ও সিভিল বিভাগ যেভাবে সাপোর্ট দেয়, আমরা সেভাবে (ট্রেন) চালাই।’

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে গত বছরের ২৪ মার্চ থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত প্রায় পাঁচ মাস সিলেট-আখাউড়া রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ১৬ আগস্ট থেকে সীমিত আকারে ট্রেন চলাচল আবার শুরু হয়। এরপর ১১ নভেম্বর সিলেট ও মৌলভীবাজারের মধ্যবর্তী ভাটেরা নামক স্থানে মালবাহী ট্রেনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। এর আগে ৭ নভেম্বর মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও জংশনে তেলবাহী ট্রেনের সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ১৫ সেপ্টেম্বর সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মাইজগাঁও এলাকায় তেলবাহী ওয়াগনের একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ২৩ আগস্ট যাত্রীবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হয় কুলাউড়া এলাকায়।

এর আগে ২০১৯ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটে ৯টি। ২৩ জুন কুলাউড়ায় সেতু ভেঙে পানিতে পড়ে যায় উপবন এক্সপ্রেসের একটি বগি। এতে পাঁচজন নিহত হয়। আহত হয় অন্তত ৬৪ জন যাত্রী।

চলতি মাসের ১৩ ফেব্রুয়ারি মৌলভীবাজারের ভাটেরা এলাকায় তেলবাহী বগি লাইনচ্যুত হয়। এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও এলাকায় তেলবাহী সাতটি বগি লাইনচ্যুত হয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, মন্ত্রী বৈঠক ডেকেছেন। আজ বুধবার বৈঠক হবে। আগের দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন আমলে নিয়ে কেন সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর বেশি তিনি বলতে পারছেন না। সমস্যা সমস্যার জায়গায়ই আছে। আর কিছু বলতে গেলে তাঁর চাকরি থাকবে না।

গতিসীমা না মানার কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে বলে মনে করছেন রেলের যুগ্ম পরিচালক (প্রকৌশল) মো. রমজান আলী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, একটা ট্রেন লোপ লাইনে (স্টেশনগুলোতে আলাদা লাইন) ঢোকার সময় ঘণ্টায় ১৬ কিলোমিটারের বেশি গতি থাকবে না বলে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এর বেশি গতি হলেই ট্রেন লাইনচ্যুত হয়।     

পূর্বাঞ্চল রেলের প্রধান প্রকৌশলী মো. সুবক্তগীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অন্য গাড়িগুলো পড়ছে না। শুধু তেলের গাড়িই কেন পড়ে? এতে বলা যায়, এটা শুধু লাইনের দোষ নয়। সেটা হলে সব গাড়িই পড়ত।’ তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি তিনটি দুর্ঘটনাই ঘটেছে তেলবাহী ট্রেনের ক্ষেত্রে। এর সবই নিচে নামার মুখে লাইনচ্যুত হয়েছে। এখানে গতির একটা বিষয় আছে, সম্ভবত চালকরা গতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না।

সিলেট-আখাউড়া রেলপথের দৈর্ঘ্য ১৭৯ কিলোমিটার। এ পথের ৯০ শতাংশ সেতুর বয়সই ৭০ বছর পেরিয়ে গেছে। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এ রকম ১৩টি স্পটকে ‘ডেড স্পট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে; এসব সেতুতে ট্রেন ওঠার আগে থেমে যাবে, পরে পাঁচ কিলোমিটার গতিতে চলা শুরু করবে। সিলেট থেকে মোগলাবাজার স্টেশন পর্যন্ত আটটি এবং মোগলাবাজার থেকে আখাউড়া পর্যন্ত পাঁচটি সেতু এই ডেড স্পটের অন্তর্ভুক্ত।