kalerkantho

বুধবার । ১৮ ফাল্গুন ১৪২৭। ৩ মার্চ ২০২১। ১৮ রজব ১৪৪২

‘পাকা ঘরে থাকব স্বপ্নেও ভাবিনি’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২৪ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘পাকা ঘরে থাকব স্বপ্নেও ভাবিনি’

এই অভিব্যক্তি স্বস্তির; এই অভিব্যক্তি কৃতজ্ঞতার। মুজিববর্ষ উপলক্ষে গতকাল দেশের যেসব ভূমিহীন মানুষ মাথা গোঁজার ঠাঁই পেয়েছেন, খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার আটলিয়া ইউনিয়নের কমলা শীলও তাঁদের একজন। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘স্বপ্নেও ভাবিনি পাকা ঘরে থাকব। পরম করুণাময় ঈশ্বর শেখ হাসিনাকে আরো অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখুক।’ জীবন সায়াহ্নে এসে পাকা ঘরের চাবি ও জমির দলিল পেয়ে এভাবেই আশীর্বাদ করছিলেন দিনমজুর ধীরেন। তাঁর বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার আয়লা চান্দখালী গ্রামে। মুজিববর্ষের উপহার হিসেবে ধীরেনের মতো হাজার হাজার মানুষ গতকাল দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাকা ঘর পেয়েছেন।

মুজিববর্ষে একজন মানুষও গৃহহীন থাকবে না—প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন ঘোষণার ধারাবাহিকতায় পৌনে ৯ লাখ গৃহহীন-ভূমিহীন পরিবারের তালিকা হয়। এর মধ্যে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে গতকাল ৬৬ হাজার ১৮৯টি পরিবারকে ঘরের মালিকানা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হয়ে গতকাল অসহায় মানুষদের ঘরের চাবি তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ‘এক দিনে এত মানুষকে ঘর দিতে পারলাম, এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া। মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী, এই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের একজন মানুষও গৃহহারা থাকবে না। যাদের গৃহ নেই তাদের ঘর করে দিতে পেরে অসাধ্য সাধন করতে পারলাম, এর চেয়ে বড় পাওয়া আর হতে পারে না।’

ঘর পেয়েছেন রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাসিন্দা লাইলী বেগম। দুই বছর আগে পদ্মার ভাঙনে তাঁর বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই থেকে তিনি কখনো মেয়ে-জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় খুঁজতেন, কখনো অন্যের বাড়িতে গৃহস্থালির কাজ করতেন। গতকাল উপজেলার হেলালপুর গ্রামে তাঁকে পাকা ঘর বুঝিয়ে দেন ইউএনও শাহিন রেজা। এ সময় ষাটোর্ধ্ব লাইলী বলেন, ‘কোনো দিন ভাবিনি আমার নিজের একটি ঘর হবে। পরিবার নিয়ে একসাথে থাকব। সত্যিই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আপা আমাদের মতো গরিবদের নিয়া ভাবেন।’

স্বামীর বাড়ি-ভিটা না থাকায় বিয়ের পর থেকে জীবনসঙ্গীকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন আঞ্জুয়ারা। বাবার বাড়ি নওগাঁর বদলগাছী উপজেলার মিঠাপুর ইউপির গন্ধর্বপুর গ্রামে। আঞ্জুয়ারা এক ছেলে ও দুই মেয়েকে বিয়ে দিয়ে জীবিকার তাগিদে রাজধানীতে পাড়ি জমান। গতকাল বদলগাছীতে পাকা ঘর পেয়ে তিনি বললেন, ‘আর ঢাকা যামু না। অ্যাখন থেকে বাড়িতে থাকুম।’

গতকাল প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে ঘর পেয়ে আবেগাল্পুত হয়ে কাঁদছিলেন ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার ভিক্ষুক শহর বানু। নিজের বয়স কত তা বলতে পারলেন না তিনি। জানালেন, স্বামী মারা গেছেন অনেক আগেই। দুই মেয়ে ছিলেন, তাঁদের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তিনি একা। স্বামী মারা যাওয়ার পর দেবরের বাড়িতে ছনের ছাউনির একটি মাটির ঘরে তাঁর বসবাস।

শহর বানুর ভাষায়, ‘আমার কুনু গর আছিন না। সারা দিন বিক্কা কইরা দেওরের বাইত একটা ছনের গর-অ রাইত কাডাইতাম। মেগ আইলে বাঙ্গা ঘরের চাল দে-য়া পানি পর-ত। অনেক কষ্ট কইরা হেই গরই থাকতাম। মা’র উছিল্লায় আমি টিনের চালওলা একটা দলান গর পাইছি, জমিন পাইছি। অহন খাই আর না খাই আরামে থাকবার পারাম। আমি নমজ (নামাজ) পইরা পরদান মন্তি শেখ হাসিনার লইগ্যা দুই আত তুইল্যা দ-য়া করি, আল্লায় যেন তারে অনেক পরমাই দেয়।’

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রথম দফায় গতকাল ঘরের চাবি দেওয়া হয়েছে চকরিয়ার ৮০ ও পেকুয়ার ৯ ভূমিহীন পরিবারকে। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্বের বক্তব্যে ইউএনও সৈয়দ শামসুল তাবরীজ বলেন, ‘মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর ঐকান্তিক ইচ্ছায় সারা দেশে প্রথম দফায় ৭০ হাজার গৃহহীন পরিবারকে বাড়ি দেওয়া হয়েছে। এসব পরিবারকে বাড়িসহ জায়গার বন্দোবস্ত দলিল হস্তান্তর করা হয়েছে।’

মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা চেয়ারম্যান এ কে এম সফি আহমদ সলমান গতকাল ঘর বিতরণ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগ বিশ্বে বিরল। আমরা যেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপহার শ্রদ্ধাভরে স্মরণ রাখি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাটুকু আমরা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। আমরা কখনো তাঁর এই অবদানের কথা ভুলব না।’

ময়মনসিংহের নান্দাইলে ঘর পেয়ে প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন অশীতিপর রোমেনা খাতুন। তাঁর ভাষায়, ‘পরের বাড়িত ও সরহারি জাগাত বালবাইচ্চা (সন্তান) লইয়া জীবন পার করছি। অহন জীবনের শেষে আইয়া মরণের ঘরের (কবর) অপেক্ষায় আছিলাম। কিন্তু কি আচম্বিত (আশ্চর্য) জীবন থাকতেই ঘর ও জায়গার দলিল পাইলাম। হিইরা (আবার) পাক্কা ঘর। দিছে বুলে প্রধানমন্ত্রী, অহন মইর‌্যা শান্তি পাইয়াম।’

বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলার গোছন গ্রামের ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা আমেনা বিবি বলেন, ‘হামি স্বপ্নেও ভাবিনি সরকার হামাক পাকা ঘর দিবি। ঘর প্যায়া হামরা খুশি হচি। শেখের বেটি হামাকেরক বড় উপকার করলো।’

সিলেটে ‘স্বপ্ননীড়ে’র চাবি হস্তান্তর অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন বলেন, ‘মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে দেশের গৃহহীন-ভূমিহীনদের বিনা মূল্যে বসতঘর হস্তান্তর বিশ্বে নতুন ধারার সূচনা করেছে।’

(এ প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহায়তা করেছেন কালের কণ্ঠ’র সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রতিনিধিরা)

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা