kalerkantho

শুক্রবার । ১৩ ফাল্গুন ১৪২৭। ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১। ১৩ রজব ১৪৪২

মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স

‘দালালের হাতের মোয়া’

সজিব ঘোষ   

১৮ জানুয়ারি, ২০২১ ০০:০০ | পড়া যাবে ৫ মিনিটে



‘দালালের হাতের মোয়া’

ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে মোটরসাইকেল চালানো জানার প্রয়োজন নেই! দরকার পড়বে না হাসপাতালের শারীরিক সক্ষমতার সনদ (মেডিক্যাল সার্টিফিকেট)। এমনকি সেবা গ্রহণকারীকে কোথাও উপস্থিত হয়ে ধরতে হবে না লাইনও। ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়া থেকে শুরু করে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়া সম্ভব এক জায়গায় দাঁড়িয়েই। দালালরাই এসব অকাজের কাজী। তাঁরাই বাতলে দেয় মোটরসাইকেলের ড্রাইভিং লাইসেন্স পাওয়ার চোরাপথ। রাজধানীর মিরপুরের বাংলাদেশ সড়ক পরিহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ঢাকা মেট্রো সার্কেল অফিসে সম্প্রতি অনুসন্ধান চালিয়ে উঠে এসেছে এসব ভয়ংকর তথ্য।

মাঠপর্যায়ে দালালচক্রের সঙ্গে আনসার সদস্যদেরও যোগসাজশ রয়েছে চোখে পড়ার মতো। চক্রের একাধিক সদস্যের সঙ্গে গ্রাহক সেজে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে আসে টাকা খরচায় বিআরটিএ থেকে কিভাবে সহজেই অবৈধপথে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স হাতে আনা যায়।

জানা যায়, দালালদের রয়েছে তিন ধরনের প্যাকেজ। একটি ১০ হাজার টাকার; যেখানে গ্রাহককে সব কিছুতেই দালালের কাছাকাছি থাকতে হয়। দালালরা গ্রাহককে কাগজ বুঝিয়ে দেয়, কখন কোথায় যেতে হবে এ জাতীয় সহায়তা বরে। আরেকটি প্যাকেজ ১২ হাজার টাকার; এ ক্ষেত্রে গ্রাহককে কোথাও যেতে হবে না। শুধু জাতীয় পরিচয়পত্রের নকল আর একটা ছবি দিলেই চলে। অন্য সব দায়িত্ব দালালের। শেষে ড্রাইভিং পরীক্ষার দিন উপস্থিত থাকতে হবে। তবে পরীক্ষা দিতে হবে না, সই করে চলে আসা যাবে। আর শেষ প্যাকেজের গ্রাহকের বেলায় এই কাজটুকুও করতে হবে না। ১৫ হাজার টাকার এই প্যাকেজে প্রথম কিস্তি দিতে হবে তিন হাজার টাকা। সেই সঙ্গে ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নকল দিলে ওই দিনই হাতে চলে আসবে লার্নার ড্রাইভিং লাইসেন্স। আর নির্দিষ্ট সময় শেষে মিলবে মূল লাইসেন্স।

১৫ হাজার টাকার প্যাকেজ পছন্দ হওয়ার পর প্রক্রিয়ার ধরন জানতে চাইলে আব্বাস (ছদ্মনাম) বলেন, ‘আপনার এত কিছু না জানলেও হবে। এইনে সব হয়। আপনে টাকা দিয়া আরামে থাকেন।’ হাসপাতালের সনদের ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘সব কিছু আমি জানি না। আমাদের সিনিয়র ভাইয়েরা আছে, বাকিটা তারা দেখে। ওইডিও ব্যবস্থা হইয়া যাইবো। টাকা যত তাড়াতাড়ি দিবেন প্রোসেস তত তাড়াতাড়ি শুরু হইবো।’

সে ক্ষেত্রে কেউ যদি মোটরসাইকেল চালাতে না জানে তা-ও সে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়ে যেতে পারবে! এ কথার উত্তরে দালাল বলেন, ‘এমন কেউ করবে না। যার দরকার সেই আসে। দরকার ছাড়া এত টাকা নষ্ট করবে না। আর আমরা মানুষকে সাহায্য করছি। বিনিময়ে কিছু বকশিশ লই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিআরটিএর উচ্চপদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দালালদের সঙ্গে ভেতরের অনেক কর্মকর্তা জড়িত। এক হাতে কখনোই তালি বাজে না। ভেতর থেকে দালালদের কেউ সাহায্য না করলে, তারা এতটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করতে পারত না। তবে এই সংখ্যা খুব বেশি না। তাঁদের আগে খুঁজে বের করতে হবে। তাহলেই দালালচক্র পুরোপুরি নির্মূল করা যাবে।’

বিআরটিএর ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক শফিকুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, ‘দালালচক্র আছে, ঢালাওভাবে এমন অভিযোগের কোনো সুযোগ নেই। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিআরটিএর ভেতরে সার্বক্ষণিক নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। রাতারাতি দালাল ঠেকানো যাবে না। এতে গ্রাহকদেরও দোষ আছে। তাঁরা সব কিছু সহজে করার জন্য দালালকে টাকা দিয়ে দেন। নিজে লাইনেও দাঁড়াতে চান না।’

দালালকে বেশি টাকা দিলে যেহেতু পরীক্ষা দিতে হবে না। তাই গাড়ি চালানো না জানলেও লাইসেন্স নেওয়া সম্ভব। এমন কথার জবাবে বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার বলেন, ‘আমি জানি না আপনি কাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তবে কিছুদিন আগে মিরপুর অফিসে এক গণশুনানিতে অভিযুক্ত আনসার কর্মীকে সাজা দেওয়া হয়েছে। বাইরে অনেকেই অনেক কিছু বলবে, এটা ম্যাটার না। ম্যাটার হলো গাড়ি চালাইতে জানে না, বিআরটিএ এমন লোককে লাইসেন্স দেয় না। আমাদের ড্রাইভিং টেস্ট বোর্ড আছে, ঢাকা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশের প্রতিনিধি, চিকিৎসক আছে। সব প্রতিনিধি মিলে সরকার নির্ধারিত বোর্ডের মাধ্যমে সব পরীক্ষায় পাস করার পরই লাইসেন্স দেওয়া হয়।’

তিনি বলেন, ‘আগে লিখিত পরীক্ষার পর ব্যবহারিক নিতে অনেক সময় লাগত। সেই সুযোগে অনেকেই অসৎ পথে যেত। আমি আসার পর সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন একই দিনে সব পরীক্ষা হয়। অন্য কারো ঢোকার সুযোগ নেই। ফলে মোটরসাইকেল চালাতে না জানলেও লাইসেন্স পাবে এটা ঠিক না। তবু এ ধরনের কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ যদি থাকে তাহলে আমরা কঠোর অ্যাকশনে যাব। দালালচক্র প্রতিটা সরকারি অফিসেই আছে। তবে বিভাগের কেউ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এখানে কেউ ছাড় পাবে না।’

মন্তব্য



সাতদিনের সেরা